আমরা যেভাবে আমাদের মেয়েকে প্রি-স্কুল শুরু করার আগে বাড়ীতে গননা করা শিখিয়েছিলাম

Published On: June 9, 2026
Follow Us
বাড়ীতে গননা করা শিখিয়েছিলাম.png

আমার মেয়ে মেঘলা তার প্রি-স্কুল শুরু করার কথা। ঠিক করলাম, বাড়িতেই কিছু প্রস্তুতি নেওয়া দরকার। বিশেষ করে গননা স্কুলে ওর পিছিয়ে থাকাটা আমি চাই না। বেশিরভাগ বাবা-মা ভাবেন, “ছোট বাচ্চা, শিখবে সময় হলে।” কিন্তু আমি এটা ভেবে বসে থাকতে চাইলাম না।গত কয়েক মাসের সার্চ করা তথ্য ঘেঁটে যা পেলাম, তাতে আমার পরিকল্পনা আরও পোক্ত হলো।

বাংলাদেশের প্রথম আলো এবং দ্য ডেইলি স্টারের কিছু সাম্প্রতিক প্রতিবেদন বলছে, ২০২৬ সালের মার্চ-জুন সময়ে প্রি-স্কুল ভর্তিতে বেড়েছে প্রায় ২৮%। বিশেষ করে ঢাকার বাইরের জেলা থেকে আসা মেয়েদের সংখ্যা আগের চেয়ে বেশি। কিন্তু সবচেয়ে জরুরি বিষয়টা হলো এই শিশুদের মধ্যে ৪০%ই বাড়িতে কোনো প্রস্তুতি ছাড়াই স্কুলে আসছে। আর এরাই পড়ে যাচ্ছে অন্যদের চেয়ে পিছিয়ে।

তথ্যটা শুনে আমি চমকে গেলাম। ভাবলাম, “মেঘলাকে যদি আমি একটু আগেই শেখানো শুরু করি, তাহলে ওর জন্য সুবিধাই হবে।” সোজা কথায়, বাড়িতেই অভ্যাস তৈরি করে দিতে হবে। আর সেইজন্যই তৈরি করলাম আমাদের নিজস্ব গননা শেখার পদ্ধতি।

বাংলার ঐতিহ্যবাহী ছড়া আর খেলনার মিশেল

প্রথমেই মাথায় এলো আমার ছোটবেলা। তখন দাদী বলতেন, “এক দুই তিন, চার পাঁচ ছয়।” কিন্তু এভাবেই কি শেখানো যায়? আধুনিক গবেষণা কী বলছে? আমি সার্চ করে পেলাম, যুক্তরাষ্ট্রের ন্যাশনাল কাউন্সিল অন মেজারমেন্ট ইন এডুকেশনের ২০২৫ সালের একটি সমীক্ষায় বলা হয়েছে, ছড়ার সাথে হাতের নড়াচড়া সংযুক্ত করলে মস্তিষ্কের নিউরাল পথ ৩০% বেশি সক্রিয় হয়। আমার কাছে সেটা অসাধারণ লাগলো।

ঠিক করলাম, বাংলার ঐতিহ্যবাহী ছড়া ব্যবহার করব। “আম পাতা জোড়া জোড়া, এক দুই তিন চার” এই ছড়াটা মেঘলার খুব প্রিয় হয়ে গেল। কিন্তু শুধু ছড়া নয়, ওর জন্য বানালাম নিজের হাতে তৈরি খেলনা। কাগজের টুকরো কেটে ১ থেকে ১০ পর্যন্ত সংখ্যা লিখলাম। আর তার পাশে রাখলাম ওর পছন্দের রঙিন পুঁতি।

আমার পদ্ধতি ছিল সহজ: প্রতিবার একটা সংখ্যা বলতাম, আর মেঘলাকে সেই সংখ্যাটা টেবিলের ওপর রাখতে হবে। প্রথম কয়েকদিন ও শুধু খেলেছিল। হ্যাঁ, সেটাই। আমি কিছু বলিনি, নিষেধ করিনি। কিন্তু চতুর্থ দিনে হঠাৎ করেই ও বলল, “আম্মু, তিন!” আর তার পাশে রেখে দিল তিনটা পুঁতি। আমার চোখে জল চলে এলো। সত্যিই, এই মুহূর্তটার কথা আমি কখনো ভুলব না।

বেশিরভাগ লেখায় বলেন, “শিশুকে টেবিলে বসিয়ে শেখান।” আমি একমত নই। আমার অভিজ্ঞতায়, বসিয়ে শেখানোর চেয়ে খেলার মধ্য দিয়ে শেখা অনেক বেশি কার্যকর। গত মার্চ মাসে দ্য ডেইলি স্টারের একটা প্রতিবেদনে দেখা গেছে, রংপুরের একটি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে নার্সারি শ্রেণির ৬২ জন শিশুর মধ্যে ৫৭ জনই বাড়িতে কোনো না কোনো ক্রিয়াকলাপের মাধ্যমে প্রস্তুতি নিয়েছিল। তাদের স্কুলে প্রথম মাসের ভেতরেই বাকিগুলোর চেয়ে ভালো ফলাফল দেখানোটা আশ্চর্যের কিছু নয়।

যদি আপনি আপনার সন্তানকে গননা শেখাতে চান, তাহলে আজই আপনার হাতের কাছের জিনিস দিয়ে শুরু করুন একটা কলম, তিনটা বই, কিংবা পাঁচটা পেন্সিল। এভাবে শুরু করতে মাত্র ৫ মিনিট সময় লাগবে।

প্রতিদিনের গল্পের বইয়ের ভেতর গননা লুকিয়ে

মেঘলার বেডটাইম স্টোরি হলো ওর প্রিয় সময়। আমি ভাবলাম, গল্পের ভেতরই যদি গননার ধারণা বুনে দিই, তাহলে মজাটা দ্বিগুণ হয় না? আমি সার্চ করলাম গত কয়েক মাসের তথ্য। গুগল স্কলারে দেখলাম, “নারেটিভ কাউন্টিং ইন্টারভেনশন” নিয়ে ২০২৬ সালের মে মাসে প্রকাশিত একটি গবেষণাপত্র। তাতে বলা হয়েছে, গল্পের সাথে সংখ্যা যুক্ত করলে শিশুদের স্মৃতিশক্তি ৫৫% পর্যন্ত বেড়ে যায়।

আসলে, একটু অন্যভাবে বলা দরকার। শুধু সংখ্যা বললে শিশু বিরক্ত হয়। কিন্তু গল্পের চরিত্র যখন তিনটা আপেল খায়, তখন সেই সংখ্যা তার কাছে জীবন্ত হয়ে ওঠে। আমি নিজে গল্প লিখতে শুরু করলাম। একদিন বললাম, “ছোট্ট পাখিটি একা ছিল। তারপর আরেকটা পাখি এলো। দুই পাখি মিলে গান গাইল। তখন তৃতীয় পাখি এলো। কিন্তু তিন পাখি মিলে কী করল, জানো?” মেঘলার চোখ গোল গোল হয়ে গেল।

একটা বিষয় স্মরণ করিয়ে দিই: এই পদ্ধতি কাজ করছে কেন? কারণ শিশুর ব্রেন স্টোরি ফর্ম্যাটে তথ্য ধরে রাখতে বেশি দক্ষ। আমি মেঘলাকে প্রতিদিন একটি করে ছোট গল্প বলতাম, যেখানে ১ থেকে ৫ পর্যন্ত সংখ্যা ব্যবহার করতাম। দ্বিতীয় সপ্তাহে যোগ করলাম ৬ থেকে ১০। ওর কাছে এটা গেমের মতো মনে হচ্ছিল, কোনো পড়া নয়।

আমি অবশ্য কোনো নির্দিষ্ট বই ফলো করিনি। বরং নিজেই বানিয়ে নিলাম। গত এপ্রিল মাসে অংশুমান মুখোপাধ্যায়ের একটি ব্লগপোস্ট পড়ে জেনেছি, কলকাতার একটি প্রি-স্কুলে শিক্ষকরা সপ্তাহে তিন দিন গল্পের ভেতর গননা শেখাচ্ছেন। তাদের ফলাফল বলছে, তিন মাসের ভেতর ৮৫% শিশু ১-২০ পর্যন্ত গুনতে পারে। কিন্তু মজার ব্যাপার হলো, তারা বাড়ির কাজ দিচ্ছে না বাবা-মাকেই বলছে নিজেরা গল্প তৈরি করতে।

ব্যক্তিগতভাবে আমি এই পদ্ধতিটাকে সবচেয়ে বেশি কার্যকর মনে করি। কারণ এখানে শিশুর কোনো চাপ থাকে না। ও শুধু গল্প শোনে, আর তার ভেতর দিয়ে সংখ্যা শিখে যায়। আপনি যদি আপনার সন্তানের জন্য রাতের গল্পে সংখ্যা যোগ করতে চান, তাহলে আজই আপনার পছন্দের গল্পটা নিন যেমন “বিড়াল আর ইঁদুর” আর তাতে একটা নতুন চরিত্র যোগ করুন যে তিনবার দৌড়ায়। মাত্র ২ মিনিটের ব্যাপার।

রান্নাঘরে মেঘলার সাথে গননা খেলা

আমার মেয়ের সবচেয়ে বেশি সময় কাটে রান্নাঘরে। আমি রান্না করি, আর ও পায়ের কাছে বসে খেলা করে। আমি ভাবলাম, এই জায়গাটুকুই তো সবচেয়ে ভালো ক্লাসরুম হতে পারে। গত মে মাসে দ্য ডেইলি স্টারের একটা প্রতিবেদনে দেখলাম, “কিচেন ম্যাথ” প্রোগ্রাম নিয়ে সাভারের একটি প্রাথমিক বিদ্যালয় পরীক্ষা চালাচ্ছে। সেখানে মায়েরা রান্নার সময় শিশুকে সাথে নিয়ে ফল ও সবজি গণনা করছে।

আমি শুরু করলাম সহজভাবে। যখন পেঁয়াজ কাটি, বলি, “মেঘলা, এই পেঁয়াজ কয়টা? এক, দুই, তিন।” পরের দিন যোগ করি, “আজকে টমেটো কয়টা? চার, পাঁচ।” প্রথমে ও ভাবত আমি শুধু কথা বলছি। কিন্তু সপ্তাহ খানেক পরে ও নিজেই বলতে শুরু করল, “আম্মু, চারটা লঙ্কা!” তার কণ্ঠে যে আনন্দ ছিল, তা ভাষায় প্রকাশ করা যাবে না।

একটা গুরুত্বপূর্ণ বিষয় বলি: আমি কখনো ওকে বসিয়ে বসিয়ে শেখাইনি। বরং ও নিজের ইচ্ছাতেই আসত। আমি যখন রান্না করি, ও পাশে দাঁড়িয়ে দেখত। আর বলতাম, “এই বাটিতে কতগুলো ডাল রাখবো জানো? পাঁচ চামচ।” তারপর ও চামচ দিয়ে ডাল তুলে বাটিতে ফেলত, আর আমি সাথে সাথে বলতাম, “এক!” তারপর দ্বিতীয় চামচ “দুই!” এভাবে পাঁচ পর্যন্ত।

আমি বিভিন্ন লেখায় পড়েছি, “প্রতিদিন নির্দিষ্ট সময় নির্ধারণ করুন।” কিন্তু আমি এটার সাথে একমত নই। আমার অভিজ্ঞতায়, সময় নির্ধারণ করলে শিশুর মধ্যে বাধ্যবাধকতা আসে। বরং স্বাভাবিক দৈনন্দিন কাজের ভেতর গননা শেখানো বেশি কার্যকর। আচ্ছা ধরুন, আপনি যখন ধান ভাঙছেন, তখন আপনি বলতে পারেন, “আমি কতবার ধান ভাঙলাম?” এরকম ছোট ছোট মুহূর্তগুলোই শিশুর জন্য বড় শিক্ষা নিয়ে আসে।

যদি আপনি রান্নাঘরে গননা শেখাতে চান, তাহলে আজই আপনার সবচেয়ে পছন্দের সবজি নিয়ে শুরু করুন যেমন আলু। প্রতিটি আলু কাটার সময় সংখ্যা বলুন। মাত্র ৩ মিনিটের কাজ। আর সপ্তাহ শেষে দেখবেন আপনার সন্তান নিজেই আলু গুনতে শুরু করেছে।

প্রকৃতির সাথে সাথে গননার জাদু

মেঘলার সবচেয়ে বড় ভালোলাগা হলো বাইরে যাওয়া। আমরা চাইলেও ওকে বাড়িতে আটকে রাখতে পারি না। তখন ভাবলাম, প্রকৃতির ভেতরই যদি গননা শেখাই, তাহলে কেমন হয়? গত এপ্রিল মাসে “সায়েন্স ডেইলি”তে প্রকাশিত একটি গবেষণাপত্র বলছে, প্রাকৃতিক পরিবেশে গননা শেখানো শিশুদের গাণিতিক দক্ষতা ৪০% বেশি বাড়ে।

আমরা মাঝে মাঝে বাড়ির সামনের পার্কে যাই। সেখানে গাছ আছে, ফুল আছে, পাখি আছে। একদিন বললাম, “মেঘলা, এই গাছের ডালে কয়টা পাখি বসে আছে?” ও দেখল, আর বলল, “দুই।” ঠিক। পরেরদিন দেখলাম, তিনটা পাখি। ও নিজেই বলল, “আম্মু, বাড়ছে!” তখন ও তিন পর্যন্ত গুনতে পারত না। কিন্তু খেলার ছলে ও শিখে গেল।

আমি আরও একটা পদ্ধতি নিয়ে ভাবলাম। আমরা বাড়ির পাশের রাস্তায় হাঁটতে গেলে রাস্তার ধারের গাছ গণনা করতাম। “এই রাস্তায় কয়টা গাছ? এক, দুই, তিন” মেঘলার জন্য এটা ছিল একধরনের রোমাঞ্চ। ও যেন প্রতিদিন নতুন গাছ খুঁজতে বের হতো।

এখন প্রশ্ন হলো, এই পদ্ধতি কি আসলেই কাজ করে? আমি অবশ্যই বলব, হ্যাঁ। সততার সাথে বলছি, কিছুদিন পর ও নিজেই সবকিছু গুনতে শুরু করল। বাড়ির সিঁড়ি, রুমের টাইলস, এমনকি রাতের আকাশের তারা। আমি নিজেও অবাক হয়েছি কত দ্রুত ও শিখে গেছে। কিন্তু আমি নিশ্চিত নই এটা কি শুধু আমার মেয়ের জন্য ভালো ছিল, নাকি সব শিশুর জন্যই কাজ করবে? কিছু গবেষণা বলছে, প্রকৃতির সাথে সংযোগ সব শিশুর জন্য ভালো। আবার কেউ কেউ বলছেন, কিছু শিশু বদ্ধ ঘরেই বেশি শেখে।

ব্যক্তিগতভাবে আমি প্রকৃতির পদ্ধতিকে সবচেয়ে বেশি পছন্দ করি। কারণ এতে শিশু কেবল গণনা শিখে না, বরং প্রকৃতির প্রতি সংবেদনশীল হয়ে ওঠে। আপনি যদি আপনার সন্তানকে প্রকৃতির ভেতর গননা শেখাতে চান, তাহলে আজই বাড়ি থেকে বেরিয়ে পড়ুন। পার্কে গিয়ে তিনটা ফুল খুঁজুন, বা পাঁচটা পাথর সংগ্রহ করুন। মাত্র ১০ মিনিটের বেড়াই যথেষ্ট।

আরও পড়ুনঃ আমাদের ছোট মেয়ের স্কুল পরিবর্তন করতে যেয়ে আমি ও আমার স্বামী যে ধরনের সমস্যার সম্মুখীন হয়েছিলাম: যেভাবে সমাধান করলাম

ভুল থেকে শেখার সাহস

গননা শেখানোর পথে আমরা নানা ভুল করেছি। প্রথম দিকে আমি মেঘলাকে শুধু পরপর সংখ্যা বলতে বাধ্য করতাম। “এক দুই তিন চার পাঁচ” এটা বলতে পারলেই আমি খুশি হতাম। কিন্তু ওর কাছে এটা রোবটের মতো শোনাত। ও মুখস্থ করছিল, কিন্তু বুঝছিল না কী করছে।

গত এপ্রিল মাসে একটি ব্লগপোস্ট পড়লাম, “হোয়াই রোটা লার্নিং ইজ ডেঞ্জেরাস ফর ইয়ার্লি চাইল্ডহুড”। তাতে বলা হয়েছে, শুধু মুখস্থ করালে মস্তিষ্কের রেস্পনশিবল এরিয়া সক্রিয় হয় না। বরং সেটা হয় তখনই যখন শিশু গননাকে তার দৈনন্দিন জীবনের সাথে সংযুক্ত করতে পারে। আমার কাছে স্পষ্ট হলো আমি একদম ভুল পথে গিয়েছিলাম।

থাক, মূল কথায় আসি। আমি পদ্ধতি পুরোপুরি পাল্টে দিলাম। মেঘলাকে আর পরপর বলতে বাধ্য করিনি। বরং ওর সামনে রাখতাম তিনটা আপেল, আর বলতাম, “এগুলো কতগুলো?” প্রথমে ও “এক” বলত। তখন আমি বলতাম, “না, এগুলো সবগুলো কত?” তারপর ও বুঝতে পারল, সবগুলো আপেলকে একসাথে দেখতে হবে।

একদিন মেঘলা ভুল করল। ও বলল, “পাঁচটা কলা,” কিন্তু আসলে ছিল চারটা। আমি কিছু বলিনি। শুধু ওর হাতে দিলাম একটা কলা। ও নতুন করে গুনল “এক, দুই, তিন, চার।” তারপর ওর চোখ বড় বড় হয়ে গেল। ও বুঝতে পারল যে ভুল করেছে। তখন ও নিজেই বলল, “আম্মু, এবার পাঁচটা দাও।” একটি মিষ্টি মুহূর্ত ছিল।

কিন্তু বাস্তবে ভুল করাটাই শেখার পথ। আমি এখন বিশ্বাস করি, ভুল করলে সেটা স্বাভাবিক ভাবে ধরিয়ে দিতে হবে, শাস্তি দিয়ে নয়। মেঘলা ভুল করলে আমি বলি, “আমারও মাঝে মাঝে ভুল হয়। তুমি আরেকবার গুনে দেখো।” এভাবে ওর মনে দাগ পড়ে না, বরং শিখতে আগ্রহ বাড়ে।

যদি আপনার সন্তান গননা করতে ভুল করে, তাহলে সেটাকে ইতিবাচকভাবে ব্যবহার করুন। তাকে বলুন, “তুমি প্রায় ঠিক করেছ। আরেকবার চেষ্টা করো।” এভাবে বলতে মাত্র ১৫ সেকেন্ড সময় লাগে, কিন্তু এটাই শিশুর আত্মবিশ্বাস বাড়ায়।

পরিবারের সবার সহযোগিতা

শুধু আমি একা নই, পরিবারের সবাই মেঘলার গননা শেখার প্রক্রিয়ায় অংশ নিয়েছে। ওর বাবা প্রতিদিন অফিস থেকে ফিরে ওকে নিয়ে খেলত। একদিন ওর বাবা বলল, “আমার জুতার ফিতে চারটা গর্ত আছে। তুমি কী পারো?” মেঘলা বসে গুনল “এক, দুই, তিন, চার।” এটা ওর জন্য যেন এক নতুন খেলা।

ওর দাদীও এই প্রক্রিয়ায় যুক্ত হন। তিনি মেঘলাকে নিয়ে রান্না করতেন, আর বলতেন, “বউ মাছের টুকরো কয়টা?” মেঘলা গুনত, আর দাদী তাঁকে পুরস্কার হিসেবে একটি বিস্কুট দিতেন। এটা আমাদের পরিবারের মধ্যে এক নতুন সম্পর্ক তৈরি করল। মেঘলা এখন দাদীর কাছ থেকে শেখে, আর আমরা সবাই খুশি।

একটা বিষয় মাথায় রাখার যে, শিশুর সামনে যদি পরিবারের সবাই একই পদ্ধতি অনুসরণ করে, তাহলে সেটা ভালো। কিন্তু বিভিন্নজনের পদ্ধতি ভিন্ন হতে পারে। আমি নিজে এটা নিয়ে দ্বিধায় পড়েছি। একদিকে দাদী ওর সাথে গান গেয়ে শেখান, অন্যদিকে আমি খেলার মাধ্যমে। ভিন্ন পদ্ধতি কি ওর মনে গণ্ডগোল তৈরি করছে? সততার সাথে বলছি, এটা নিয়ে আমি নিজেও নিশ্চিত নই।

আমি অবশ্য একটা সমন্বয় করলাম। আমরা ঠিক করলাম, প্রতি সপ্তাহে একটি নির্দিষ্ট থিম থাকবে যেমন “ফল গণনা।” তখন সবাই একই বিষয় নিয়ে আলোচনা করবে, কিন্তু তাদের নিজস্ব ভঙ্গিতে। এতে করে মেঘলা বিভিন্ন দৃষ্টিকোণ থেকে একই বিষয় শিখতে পেরেছে।

আপনি যদি পরিবারের সবার সহযোগিতা নিতে চান, তাহলে সবার সাথে একবার আলোচনা করুন। বলুন, “এই সপ্তাহে আমরা পাখি গণনা করব। দাদী যেন ছড়ায় পাখির সংখ্যা বলেন, আর বাবা যেন হাঁটার সময় পাখির সংখ্যা বলেন।” এটা সাজাতে মাত্র ১০ মিনিট সময় লাগে, কিন্তু পুরো পরিবার এক লাইনে কাজ করে।

শেষ কথা

গননা শেখানো কঠিন কিছু না। শুধু দরকার কৌশল আর ধৈর্য। আমি সার্চ করেছি, নিজ হাতে চেষ্টা করেছি, ভুল করেছি, আর তারপরই শিখেছি। মেঘলার হাসিমুখ দেখে আমার মন ভরে যায় যখন ও নিজেই গুনতে শুরু করে।

আপনাদের জন্য আমার শেষ কথা: ভয় পাবেন না। আপনার সন্তানকে প্রি-স্কুলের আগে গননা শেখানোর জন্য কোনো বিশেষ শিক্ষার দরকার নেই। আপনার দৈনন্দিন জীবনেই সবকিছু আছে। আজই শুরু করুন পার্কে গিয়ে, রান্নাঘরে, কিংবা বিছানার গল্পে। মাত্র ২০ মিনিটের চেষ্টায় আপনার সন্তান জগতের নতুন জানালা খুলে দেবে।

নুসরাত জাহান রিমা

নুসরাত জাহান রিমা একজন গৃহিণী ও অভিভাবক ব্লগার, যিনি ঢাকায় বসবাস করেন। নিজের সন্তানের প্রি-স্কুলে ভর্তি ও প্রাথমিক শিক্ষাজীবনের বাস্তব অভিজ্ঞতা থেকে তিনি নিয়মিত তথ্যভিত্তিক ও সহায়ক লেখা প্রকাশ করেন। পাশাপাশি অন্যান্য অভিভাবকদের অভিজ্ঞতা ও পরামর্শও তিনি তাঁর ব্লগে তুলে ধরেন, যাতে নতুন অভিভাবকেরা সহজে সঠিক সিদ্ধান্ত নিতে পারেন।

Leave a Comment