খেলার ছলে পড়াশোনা: আমাদের বাচ্চাকে যেভাবে আমরা আনন্দের সাথে শেখাই

Published On: June 5, 2026
Follow Us
খেলার ছলে পড়াশোনা.png

আমার ছোট মেয়ে একদিন বলল, “মা, পড়তে ভালো লাগে না।” সেদিন আমি থমকে গিয়েছিলাম। ভেতরে একটা প্রশ্ন জেগে উঠল এই কথাটা কি শুধু আমার মেয়ের, নাকি হাজার হাজার ঘরের একই গল্প? উত্তরটা জানা ছিল, তবুও খুঁজলাম।

সত্যিই। শিশুরা যখন শুধু মুখস্থ করে, তখন তাদের মস্তিষ্ক একটি যন্ত্রের মতো কাজ করে। কিন্তু খেলার মধ্যে শেখার সুযোগ আসলে সেই যন্ত্রটাই জীবন্ত হয়ে ওঠে। খেলা শৈশবের একটি মৌলিক কার্যক্রম, যা কেবল বিনোদনের বাইরে গিয়ে শিশুর মানসিক, সামাজিক, আবেগিক এবং শারীরিক বিকাশে গভীর ভূমিকা রাখে। এই উপলব্ধিটা মাথায় আসার আগ পর্যন্ত আমরা অনেকেই ভুল পথে হেঁটেছি।

বেশিরভাগ অভিভাবক ভাবেন, পড়াশোনা মানেই বই-খাতা-কলম। আমি একমত নই, কারণ এই ধারণাটা শিশুর স্বাভাবিক কৌতূহলকে চিরতরে নষ্ট করে দিতে পারে। গবেষণা বলছে, খেলার মধ্যে শিশুরা নতুন তথ্য শেখে এবং একই সাথে সৃজনশীলতা, সমালোচনামূলক চিন্তাশক্তি, সামাজিক ও আবেগিক দক্ষতা অর্জন করে। এটা কোনো তত্ত্বকথা নয়, পরিমাপযোগ্য উপাত্ত।

খেলাভিত্তিক শিক্ষা মূলত “প্রাসঙ্গিক শিক্ষণ তত্ত্ব”-এর উপর দাঁড়িয়ে আছে, যা বলে যে শেখাটা সবচেয়ে কার্যকর হয় যখন তা বাস্তব প্রসঙ্গের মধ্যে ঘটে। সোজা কথায়, বাচ্চা যদি লুডু খেলতে খেলতে সংখ্যা চিনতে পারে, সেটা ক্লাসরুমের ড্রিলের চেয়ে অনেক বেশি মস্তিষ্কে গেঁথে যায়।

গবেষকরা দেখিয়েছেন, খেলা শিশুর আত্মনিয়ন্ত্রণ এবং কার্যনির্বাহী কার্যক্ষমতা বিকাশে সাহায্য করে, যা বিদ্যালয়ের প্রস্তুতি এবং আজীবন শেখার জন্য অপরিহার্য। তাহলে প্রশ্নটা আর “পড়বে কি খেলবে?” নয়, বরং “খেলতে খেলতে কীভাবে পড়াব?”

যদি আপনার সন্তানও পড়তে অনীহা দেখায়, তাহলে আজই একটা ছোট পরীক্ষা করুন, পাটিগণিতের অঙ্কটা ছেড়ে দিন, বরং দশটা পাথর দিয়ে ভাগ-যোগ খেলান। মাত্র দশ মিনিটের পরিবর্তন বড় ফল দিতে পারে।

খেলার মাধ্যমে শেখানোর তিনটি প্রমাণিত কৌশল

আচ্ছা ধরুন, একটা বাচ্চাকে আপনি বর্ণমালা শেখাবেন। দুটো পথ আছে, এক, চার্ট ধরিয়ে মুখস্থ করানো। দুই, বর্ণমালার কার্ড বানিয়ে লুকিয়ে রাখা আর খুঁজে বের করতে বলা। দ্বিতীয় পথে শিশু নিজেই শিক্ষার্থী হয়ে ওঠে। অবাক লাগলো? আমারও লেগেছিল।

শিক্ষকদের জ্ঞান মূলত তিন ধরনের খেলার চারপাশে ঘুরে আসে: শিশু-উদ্যোগে মুক্ত খেলা, পাঠ্যক্রমের লক্ষ্য সমন্বিত শিক্ষক-নির্দেশিত পরিচালিত খেলা এবং মুক্ত ও পরিচালিত খেলার মিলিত ভারসাম্যপূর্ণ পদ্ধতি। এই তিনটি ধারাকে আমি নিজে পরীক্ষা করেছি আমার সন্তানের উপর, এবং পার্থক্যটা চোখে দেখা যায়।

মুক্ত খেলার শক্তি

মুক্ত খেলায় বাচ্চা নিজেই সিদ্ধান্ত নেয়। এতে তার মধ্যে স্বাধীনতাবোধ তৈরি হয়। এই ধরনের খেলা শিশুকে স্বাধীনভাবে অন্বেষণ করতে, কল্পনা করতে এবং সামাজিকতা গড়ে তুলতে সক্ষম করে। আমার ছেলে যখন মাটি দিয়ে মানচিত্র বানায়, সে আসলে ভূগোল শিখছে, অথচ জানেও না।

পরিচালিত খেলার ব্যবহারিক সুবিধা

তবে শুধু মুক্ত খেলায় সবকিছু হয় না। পরিচালিত খেলায় অভিভাবক বা শিক্ষক একটি লক্ষ্য নির্ধারণ করে দেন। সাম্প্রতিক গবেষণায় দেখা গেছে, খেলাভিত্তিক পদ্ধতি ব্যাপকভাবে গৃহীত হয়েছে এবং বিশেষ করে গণনার খেলা, গল্প বলা ও ভূমিকা পালনের মাধ্যমে সংখ্যা ও ভাষাজ্ঞানের সমন্বয় ঘটানো হচ্ছে।

এই পদ্ধতি প্রযুক্তিগত ও কৌশলগত দক্ষতা বাড়ানোর পাশাপাশি প্রত্যাশা, সিদ্ধান্ত গ্রহণ এবং সমস্যা সমাধানের মতো মানসিক দক্ষতাও বিকশিত করে। এটা আমি শুধু বই থেকে পড়িনি, নিজের বাচ্চার সাথে ঘরে করে দেখেছি।

আরও পড়ুনঃ বাচ্চা স্কুলে যেতে চায় না: আমি আর আমার স্বামী যেভাবে এই সমস্যার সমধান করলাম

ব্যক্তিগতভাবে আমি পরিচালিত খেলাকে মুক্ত খেলার চেয়ে বেশি কার্যকর মনে করি, মূলত কারণ এতে শিশুর মনোযোগ একটি নির্দিষ্ট বিষয়ের দিকে আলতো করে ঠেলে দেওয়া যায়, অথচ চাপ তৈরি হয় না।

আমি যে সহজ নিয়মটা মেনে চলি: প্রতিটি খেলায় একটাই শেখার উদ্দেশ্য রাখুন, বেশি হলে সেটা আর খেলা থাকে না, পরীক্ষা হয়ে যায়। আপনিও পরের খেলা-শেখার সেশনে চেষ্টা করে দেখুন।

গানে-ছড়ায়-গল্পে যেভাবে গণিত আর ভাষা শেখানো যায়

আমার ছোটবেলায় মা ছড়া বলতেন “এক যে ছিল রাজা, তার ছিল এক প্রজা।” আমি জানতামও না তখন, মা আসলে সংখ্যা শেখাচ্ছিলেন। এই পদ্ধতিটাই এখন গবেষণায় স্বীকৃত।

খেলাভিত্তিক শিক্ষা সামাজিক দক্ষতা, সংস্কৃতি, মূল্যবোধ ও নিয়মনীতি অর্জনে সহায়তা করে এবং এর মধ্য দিয়ে স্থিতিস্থাপকতা, আত্মসম্মান, আত্মবিশ্বাস, সহযোগিতা এবং শিশুর স্বতঃপ্রণোদনা স্পষ্টভাবে বিকশিত হয়।

আসলে, একটু অন্যভাবে বলা দরকার। গান আর গণিত আলাদা মনে হলেও এই দুটো শেখানোর পথ একই ছন্দ। ছন্দময় কথা মস্তিষ্কে অনেক দ্রুত প্রবেশ করে। তাই নামতা যদি গানের সুরে শেখানো যায়, সেটা যান্ত্রিক পুনরাবৃত্তির চেয়ে তিনগুণ দ্রুত মনে থাকে।

বেশিরভাগ লেখায় বলা হয়, ছোট বাচ্চাদের গল্প শোনানো শুধু ঘুম পাড়ানোর জন্য। আমি একমত নই, কারণ গল্পের মাধ্যমে কার্যকারণ সম্পর্ক, সংখ্যার ক্রম, এমনকি বৈজ্ঞানিক ধারণাও দেওয়া সম্ভব। একটি গল্পে যদি তিনটি ভালুক তিনটি বাটিতে তিন ধরনের খাবার খায়, সেটা আসলে সংখ্যা-মিলানোর একটি খেলা।

ঐতিহ্যবাহী খেলার মাধ্যমে সামগ্রিক শিশু বিকাশ ঘটে বলে গবেষণা প্রমাণ করেছে। এটাই সবচেয়ে আশার কথা। আমাদের নিজেদের সংস্কৃতির লুকোচুরি, ডাংগুলি বা কানামাছি শুধু মনোরঞ্জন নয়, এগুলো গভীর শিক্ষার মাধ্যম।

থাক, মূল কথায় আসি। গানে-ছড়ায় শেখানোর সবচেয়ে বড় সুবিধা হলো, বাচ্চা কখন শিখছে সেটা সে নিজেও বোঝে না। এই অনুভূতিটাই তাকে শেখার প্রতি ভয়মুক্ত রাখে।

যদি গণিত নিয়ে আপনার বাচ্চার ভয় থাকে, তাহলে আজই একটি ছড়া বানান। ঘরের জিনিস গণনা করে সেটা ছন্দে বলুন। পাঁচ মিনিটের এই অভ্যাসটা মাসখানেকে অবাক করা ফল দেবে।

ঘরের সহজ উপকরণে যে খেলাগুলো সেরা শিক্ষক

বাজার থেকে দামি খেলনা কেনার দরকার নেই। জানেন, আমার বাড়িতে সবচেয়ে ভালো শিক্ষার উপকরণ হলো পুরনো পত্রিকা, ডালের দানা আর রঙিন কাপড়ের টুকরো।

খেলাভিত্তিক শিক্ষার একটি সাম্প্রতিক পদ্ধতিগত পর্যালোচনায় নয়টি তথ্যভান্ডার থেকে ১,৪৭৫টি গবেষণাপত্র যাচাই করে ৮৭টি বেছে নেওয়া হয়, যেগুলো শিক্ষার মূল সূচক হিসেবে পছন্দের স্বাধীনতা, বিস্ময় ও আনন্দকে চিহ্নিত করেছে। এই তিনটি উপাদান ঘরে বসেই তৈরি করা সম্ভব, বাড়তি খরচ ছাড়াই।

নিচের তালিকায় ঘরোয়া উপকরণ দিয়ে তৈরি কিছু কার্যকর শেখার খেলা দেওয়া হলো:

উপকরণ খেলার নাম যা শেখানো যায় উপযুক্ত বয়স
ডালের দানা দানা গণনা সংখ্যা, ভাগ-যোগ ৩-৬ বছর
রঙিন কাগজের টুকরো রঙ মেলানো শ্রেণিকরণ, রঙের ধারণা ২-৫ বছর
পুরনো পত্রিকা বর্ণ খোঁজা অক্ষরজ্ঞান, মনোযোগ ৪-৭ বছর
পানির বোতল ও বালি মাপের খেলা পরিমাপের ধারণা, তুলনা ৪-৮ বছর
বোতাম ও সুতো সুতো গাঁথা সংখ্যার ধারা, হাতের দক্ষতা ৫-৯ বছর

সততার সাথে বলছি, এই তালিকার প্রতিটি খেলা আমি নিজে চেষ্টা করে দেখেছি কি না, সেটা নিয়ে আমি নিজেও পুরোপুরি নিশ্চিত নই। তবে মূল নীতিটা পরীক্ষিত হাতের কাজ মস্তিষ্কের একাধিক অংশকে একসাথে সক্রিয় করে।

শিশুদের আঁকিবুঁকির সুযোগ দিলে তাদের সুপ্ত মেধার বিকাশ ঘটে এবং মানসিক অগ্রগতিও হয়। তাই বাচ্চা দেয়ালে আঁকতে চাইলে থামাবেন না। বরং একটা পুরনো চাদর মেঝেতে বিছিয়ে দিন।

যদি আপনি সংখ্যার ভয় কাটাতে চান, তাহলে আজই রান্নাঘরের মশলার কৌটো নামিয়ে একসাথে গণনা করুন। দশ মিনিটের এই খেলাটা কোনো অঙ্কের বইয়ের চেয়ে কম কার্যকর নয়।

আরও পড়ুনঃ অক্ষর জ্ঞান নয়, প্রি-স্কুলে যাওয়ার আগে বাচ্চার ‘পেন্সিল হোল্ডিং মাসল’ শক্ত করার ৫টি ঘরোয়া থেরাপি

বিদ্যালয়ের পাঠ্যক্রমের সাথে খেলাকে জুড়ে দেওয়ার উপায়

একটা প্রশ্ন অনেকেই করেন, খেলাভিত্তিক শিক্ষা কি পরীক্ষার জন্য প্রস্তুতিতে কাজ দেয়? আমার উত্তর হ্যাঁ, তবে সরাসরি নয়, পরোক্ষভাবে। এই “পরোক্ষ” পথটাই আসলে শক্তিশালী।

সম্প্রতি অস্ট্রেলিয়া, ফিলিপাইন এবং সংযুক্ত আরব আমিরাতের ৪৩০ জন শিক্ষকের উপর পরিচালিত একটি গবেষণায় প্রাথমিক শিক্ষার পাঠ্যক্রমে খেলাভিত্তিক শিক্ষার সাথে ভাষা ও সংখ্যাজ্ঞানের সমন্বয় করার বিষয়টি বিশ্লেষণ করা হয়। তাদের অভিজ্ঞতা বলছে, যে বাচ্চারা খেলতে খেলতে শিখেছে, তারা পরবর্তীতে পরীক্ষাতেও মনোযোগ ধরে রাখতে পারে বেশিক্ষণ।

গবেষণায় দেখা গেছে, যেসব শিশু তিন বা তার বেশি বছর ধরে খেলাভিত্তিক প্রাক-প্রাথমিক শিক্ষায় অংশ নিয়েছে, পরবর্তীতে তাদের বিদ্যালয়-প্রস্তুতি যাচাই করে তাদের শিক্ষার্থী, অন্বেষক, যোগাযোগকারী ও সহমর্মী হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। এই চারটি গুণ মিলেই তৈরি হয় একজন প্রকৃত মেধাবী শিক্ষার্থী।

আমি নিজে বাচ্চার স্কুলের পাঠের সাথে ঘরের খেলাকে জুড়ে দেওয়ার একটা সহজ পদ্ধতি মেনে চলি। সপ্তাহে একদিন ক্লাসের পড়াটাকে একটা “মিশন” হিসেবে উপস্থাপন করি। যেমন, বিজ্ঞানের পাঠে গাছের বৃদ্ধি থাকলে বাচ্চাকে একটা বীজ মাটিতে পুঁততে বলি আর পরিবর্তন রেকর্ড করতে বলি। এতে সে শুধু পড়ে না, করে।

আবার, উচ্চমানের খেলাভিত্তিক শিক্ষার পরিবেশ সহযোগিতা, যোগাযোগ এবং সমস্যা সমাধানের দক্ষতা বৃদ্ধিতে সহায়তা করে। এই তিনটি দক্ষতা এখন যেকোনো পরীক্ষার চেয়ে চাকরির বাজারে বেশি মূল্যবান।

হ্যাঁ, এটা একদম স্পষ্ট কথা কাগজে-কলমে। বাস্তবে কিন্তু বেশিরভাগ বিদ্যালয় এখনো মুখস্থনির্ভর। তাই ঘরে এই ভারসাম্যটা আমাদেরই তৈরি করতে হবে।

পরের পরীক্ষার আগে বাচ্চাকে পড়ার পরিবর্তে একটি “প্রশ্নোত্তর প্রতিযোগিতা” খেলতে বলুন। পরিবারের সবাই মিলে অংশ নিন। এটা পাঁচ মিনিটের কাজ, কিন্তু স্মৃতিশক্তিতে যা গেঁথে দেবে, সেটা রাতভর পড়াও পারবে না।

আরও পড়ুনঃ স্কুল ইন্টারভিউয়ের ভয় দূর করতে আমরা যেভাবে ড্রয়িং রুমে ‘খেলার ছলে’ মক-টেস্ট নিয়েছিলাম

অভিভাবকের ভূমিকা: শিক্ষক নয়, খেলার সাথী হওয়া

এখানে একটা কথা বলা দরকার, যেটা অনেকেই এড়িয়ে যান। বাচ্চার সাথে খেলাভিত্তিক শিক্ষায় অভিভাবকের নিজের উপস্থিতি সবচেয়ে বড় উপাদান। অথচ আমরা প্রায়ই ভুলে যাই যে আমরা নিজেরাই সেরা শিক্ষার পরিবেশটা তৈরি করতে পারি।

একটি পদ্ধতিগত পর্যালোচনায় খেলাভিত্তিক শিক্ষার কার্যকর রূপায়ণের ধরন খোঁজা হয়েছে এবং শিক্ষণের মূল সূচক হিসেবে পছন্দের স্বাধীনতা, বিস্ময় এবং আনন্দকে চিহ্নিত করা হয়েছে। এই তিনটি উপাদান কেবল তখনই সম্ভব যখন পাশে থাকা মানুষটি নিজেও মুক্তমনে অংশ নেয়।

বেশিরভাগ লেখায় বলা হয়, অভিভাবকের কাজ হলো নির্দেশনা দেওয়া। আমি একমত নই। কারণ বাচ্চা যখন দেখে অভিভাবক নিজেই খেলছেন, হাসছেন, ভুল করছেন আর সেটা শুধরে নিচ্ছেন, তখন সে শেখার একটি জীবন্ত মডেল পায়।

খেলাভিত্তিক শিক্ষা সামাজিক দক্ষতা, সংস্কৃতি ও মূল্যবোধ অর্জনে সহায়তা করে এবং এর মাধ্যমে আত্মবিশ্বাস, সহযোগিতা ও শিশুর ন

নেতৃত্বের গুণাবলি তৈরি হয়। গবেষণা বলছে, ৪৪৮টি স্বাধীন গবেষণার পর্যালোচনায় দেখা গেছে যে অভিভাবকরা যখন সন্তানের শেখার সাথে যুক্ত থাকেন, তখন শিক্ষার্থীরা উচ্চতর একাডেমিক অর্জন, বিদ্যালয়ে সম্পৃক্ততা এবং অনুপ্রেরণা দেখায়। এই সংখ্যাটা কিন্তু ছোট নয় ৪৪৮টি গবেষণা একসাথে একই কথা বলছে।

তাহলে আমরা অভিভাবক হিসেবে কী করতে পারি? সহজ উত্তর নির্দেশক হওয়া বন্ধ করুন, অংশগ্রহণকারী হন। গবেষণায় দেখা গেছে, গাইডেড প্লে অর্থাৎ যেখানে শিশুর নিজস্ব সিদ্ধান্তের স্বাধীনতা থাকে এবং পাশাপাশি একজন প্রাপ্তবয়স্ক শেখার লক্ষ্যের দিকে আলতো সহায়তা দেন সেটা মুক্ত খেলার চেয়েও বেশিরভাগ ধারণা শেখাতে কার্যকর। অর্থাৎ, পুরোপুরি ছেড়ে দেওয়াও নয়, আবার পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণ করাও নয় মাঝামাঝি একটি সচেতন সঙ্গ।

যেসব শিশু বিদ্যালয়ের বাইরে অভিভাবকের সক্রিয় সম্পৃক্ততা পায়, তাদের উচ্চমাধ্যমিক সম্পন্ন করার সম্ভাবনা বেশি থাকে এবং এটি প্রমাণ করে যে সন্তানের দৈনন্দিন জীবনে সক্রিয়ভাবে যুক্ত থাকা শুধু পড়াশোনার বাইরেও শিক্ষাগত ফলাফলকে উল্লেখযোগ্যভাবে প্রভাবিত করতে পারে।

তাই আজ থেকেই একটাই কাজ করুন বাচ্চার সাথে মাটিতে বসুন, তার খেলায় মিশে যান, বোকার মতো প্রশ্ন করুন, হাসুন। এটাই সবচেয়ে বড় বিনিয়োগ।

শেষ কথা

খেলাভিত্তিক শিক্ষা কোনো বিলাসিতা নয়, এটি শিশুর স্বাভাবিক বিকাশের সবচেয়ে প্রাকৃতিক পথ। আমরা প্রায়ই ভুলে যাই যে একটি শিশু যখন খেলে, সে আসলে পুরো পৃথিবীটাকে বোঝার চেষ্টা করে। দশকের পর দশক ধরে গবেষণা দেখিয়েছে যে অভিভাবকরা যখন সন্তানের শেখার সাথে ঘরে এবং বিদ্যালয়ে উভয় জায়গায় যুক্ত থাকেন, তখন শিক্ষার্থীর অর্জন ও সার্বিক সুস্থতা বৃদ্ধি পায়। এই সত্যটি জানা আর মেনে চলার মধ্যে যে দূরত্ব, সেটা কমানোই আমাদের আসল কাজ।

পরীক্ষায় ভালো নম্বর পাওয়া একটি লক্ষ্য হতে পারে, কিন্তু সেটাই সব নয়। গাইডেড প্লের বাস্তবায়নের মাত্রা এবং শিশুর জ্ঞানীয় ও সামাজিক বিকাশের মধ্যে পরিসংখ্যানগতভাবে উল্লেখযোগ্য ইতিবাচক সম্পর্ক পাওয়া গেছে। অর্থাৎ, খেলার মাধ্যমে শেখা মানে শুধু আনন্দ নয় এটি সুনির্দিষ্টভাবে পরিমাপযোগ্য বিকাশও। একটি শিশু যদি ছোটবেলা থেকেই কৌতূহলী হয়ে ওঠে, প্রশ্ন করতে শেখে এবং ভুল থেকে শিখতে অভ্যস্ত হয়, তাহলে সে বড় হয়ে যেকোনো চ্যালেঞ্জ মোকাবেলা করতে পারে।

শেষমেশ, খেলাভিত্তিক শিক্ষার সবচেয়ে বড় উপহার হলো এটি শিশুকে শেখার প্রেমে ফেলায়। আর যে শিশু একবার শেখাকে ভালোবাসে, তাকে আর পেছন থেকে ঠেলতে হয় না। অভিভাবকদের যদি তাদের সন্তানের সাথে খেলার দক্ষতা সম্পর্কে সামান্য দিকনির্দেশনাও দেওয়া যায়, তাহলে এই মিথস্ক্রিয়া আরও ফলপ্রসূ হয়ে ওঠে। তাই আজই শুরু করুন একটি ছোট খেলা, একটু বেশি হাসি, আর একটু বেশি উপস্থিতি দিয়ে।

নুসরাত জাহান রিমা

নুসরাত জাহান রিমা একজন গৃহিণী ও অভিভাবক ব্লগার, যিনি ঢাকায় বসবাস করেন। নিজের সন্তানের প্রি-স্কুলে ভর্তি ও প্রাথমিক শিক্ষাজীবনের বাস্তব অভিজ্ঞতা থেকে তিনি নিয়মিত তথ্যভিত্তিক ও সহায়ক লেখা প্রকাশ করেন। পাশাপাশি অন্যান্য অভিভাবকদের অভিজ্ঞতা ও পরামর্শও তিনি তাঁর ব্লগে তুলে ধরেন, যাতে নতুন অভিভাবকেরা সহজে সঠিক সিদ্ধান্ত নিতে পারেন।

Leave a Comment