আমার বান্ধবী পারুল যেভাবে তার ছোট মেয়েকে বড়দের সাথে আচরণ করার শিক্ষা দেয়

Published On: June 15, 2026
Follow Us
বড়দের সাথে আচরণ করার শিক্ষা.png

পারুলকে চিনি বছর সাতেক ধরে। সে কখনো জোরে কথা বলে না। কিন্তু যখন তার ছোট মেয়ে তিয়াশাকে বড়দের সামনে ব্যবহার করতে দেখি, তখন সত্যিই মুগ্ধ হই। পাঁচ বছর বয়সী একটা মেয়ে পাড়ার কাকিমাকে সালাম দিচ্ছে, ছোট্ট করে বলছে, “আস-সালামু আলাইকুম”, তারপর মুখভরা হাসি। এটা কোনো সিনেমার দৃশ্য নয়, এটা তাদের প্রতিদিনের জীবনের অংশ। আর এই ছোট্ট অভ্যাসগুলোর পেছনে যে যত্ন, ধৈর্য আর সচেতন শিক্ষা আছে, সেটাই আজকের লেখার বিষয়।

পারুলের প্রথম পাঠ: ঘরের ভেতরেই শুরু হয় আসল অনুশীলন

বেশিরভাগ মানুষ মনে করেন শিশুকে বাইরে নিয়ে গেলেই সে সামাজিক আচরণ শিখবে। আমি এই ব্যাপারে একমত নই, কারণ পারুলের পদ্ধতি দেখে বুঝলাম উল্টোটাই সত্যি। বাচ্চাদের বিভিন্ন পরিস্থিতিতে মানিয়ে নেওয়ার জন্য প্রথমে ঘরে বসেই প্রস্তুত করতে হয়, তাহলে ঘরের বাইরে গিয়ে তারা অস্বস্তিতে পড়বে না। পারুল ঠিক এই কাজটাই করে। প্রতিদিন সন্ধ্যায় সে তিয়াশাকে নিয়ে ছোট্ট একটা “অনুশীলন সেশন” করে। সেখানে সে নিজে বড়দের ভূমিকায় থাকে, আর তিয়াশা অতিথির ভূমিকায়। সালাম, কদমবুসি, ধন্যবাদ বলা এই তিনটা জিনিস রোজ চর্চা করায় পারুল তাঁর মেয়ে তিয়াশাকে।

যাইহোক, আজকের লেখার মূল কথায় আসি। পারুল শুধু মুখে মুখে শেখায় না, সে নিজেই করে দেখায়। শিশুরা বড়দের কথা যতটা না শোনে, তার চেয়ে অনেক বেশি তাদের আচরণ অনুকরণ করে। পারুল এটা খুব ভালো করেই জানে। সে প্রতিবেশীদের সঙ্গে যেভাবে ভদ্রভাবে কথা বলে, যেভাবে সম্মান দেখায়, তিয়াশাও সেগুলো দেখে দেখে শিখে নিচ্ছে। এখানে কোনো বকাঝকা নেই, নেই জোর করে শেখানোর চেষ্টা। আছে শুধু ভালো উদাহরণ আর নিয়মিত চর্চা।

বিস্ময়কর যে কথাটা কেউ বলে না: শিশু যখন তার মাকে বড়দের সম্মান করতে দেখে, তখন সে নিজেও সেটাকে জীবনের স্বাভাবিক অংশ হিসেবে গ্রহণ করে। এই শেখাটা ভয় থেকে আসে না, আসে ভালোবাসা আর অনুকরণ থেকে। আর এখানেই সবচেয়ে বড় পার্থক্য। প্রতিদিনের ছোট ছোট আচরণ, কথা বলার ধরন আর ব্যবহার থেকেই শিশুরা শিখে যায় কীভাবে একজন ভদ্র, আত্মবিশ্বাসী এবং মানবিক মানুষ হয়ে উঠতে হয়।

আপনার সন্তানকে ভদ্রতা ও সম্মানের প্রথম পাঠ শেখাতে চাইলে আজ থেকেই ছোট্ট একটা অভ্যাস গড়ে তুলতে পারেন। প্রতিদিন মাত্র পাঁচ মিনিট সময় নিয়ে এমন একটি পরিবেশ তৈরি করুন, যেখানে আপনি নিজেই আগে সালাম বা শুভেচ্ছা জানাবেন, আর সন্তান সেটা দেখবে। শিশুদের শেখার সবচেয়ে বড় মাধ্যম হলো অনুকরণ। তাই নিয়মিত ভালো উদাহরণ দেখাতে পারলে অল্প সময়ের মধ্যেই তার আচরণে ইতিবাচক পরিবর্তন লক্ষ্য করতে পারবেন।

গল্প ও উপমা: পারুল যেভাবে শিক্ষাকে মজার করে তোলে

জানেন, তিয়াশার সবচেয়ে প্রিয় কাজ কী? গল্প শোনা। আর পারুল সেই ভালোবাসাটাকেই শেখানোর মাধ্যম বানিয়েছে। প্রতিরাতে ঘুমানোর আগে সে তিয়াশাকে এমন সব গল্প শোনায়, যেখানে নায়ক বা নায়িকা ভদ্র, সম্মানজনক আচরণ করে এবং সবার ভালোবাসা পায়। সেখানে ভয় দেখিয়ে শিক্ষা দেওয়া হয় না, শাস্তির কথাও থাকে না। বরং ভালো আচরণের ইতিবাচক ফলাফলই গল্পের মূল বার্তা হয়ে ওঠে।

শিশুরা স্বভাবতই গল্পপ্রিয়। তারা গল্পের চরিত্রগুলোর সঙ্গে নিজেদের মিলিয়ে দেখতে ভালোবাসে এবং অনেক সময় সেই চরিত্রগুলোর আচরণ নিজের জীবনেও অনুসরণ করার চেষ্টা করে। এ কারণেই গল্প ও উপমা শিশুদের আদব-কায়দা ও মূল্যবোধ শেখানোর একটি কার্যকর মাধ্যম। পারুলও প্রায় এক বছর আগে এই পদ্ধতি অনুসরণ করা শুরু করেছিল। ফলাফলও চোখে পড়ার মতো। এখন তিয়াশা শুধু নিজে বড়দের সম্মান করে না, ছোট বোনকেও গল্পের মাধ্যমে সেই শিক্ষাই দেওয়ার চেষ্টা করে।

ব্যক্তিগতভাবে আমি গল্পের মাধ্যমে শেখানোর পদ্ধতিকেই বকাঝকা বা শাস্তির চেয়ে বেশি কার্যকর মনে করি। কারণ এতে শিশুর মনে ভয় নয়, বরং অনুপ্রেরণা তৈরি হয়। আর অনুপ্রেরণা থেকে গড়ে ওঠা অভ্যাস সাধারণত অনেক বেশি স্থায়ী হয়। পারুল একবার আমাকে বলেছিল, “আমি চাই তিয়াশা বড়দের সম্মান করুক ভালোবাসা থেকে, ভয় থেকে নয়।” কথাটা শুনে বেশ ভালো লেগেছিল। আসলে শিশুদের সুন্দর ব্যবহার শেখানোর ক্ষেত্রে এটাই হওয়া উচিত আমাদের মূল লক্ষ্য।

শিশুর সুন্দর আচরণ শুধু তাকে ভদ্রই করে তোলে না, বরং তার মধ্যে মানবিকতা, আত্মবিশ্বাস, সহমর্মিতা ও সামাজিক দক্ষতার মতো গুরুত্বপূর্ণ গুণগুলোও গড়ে তোলে। তাই পারুল শুধু “সালাম দাও” বলে দায়িত্ব শেষ করে না। সে তিয়াশাকে বোঝায় কেন সালাম দেওয়া উচিত, কীভাবে একটি ছোট্ট শুভেচ্ছা অন্য মানুষের মুখে হাসি ফোটাতে পারে এবং সম্পর্ককে আরও সুন্দর করে তুলতে পারে।

আচ্ছা, আজ রাতে একটা ছোট্ট চেষ্টা করে দেখুন না। আপনার সন্তানকে এমন একটি মজার গল্প শোনান, যেখানে মূল চরিত্রটি ভদ্র আচরণ ও বড়দের সম্মান করে সবার ভালোবাসা অর্জন করে। গল্পটি খুব বড় হওয়ারও দরকার নেই মাত্র দশ মিনিটই যথেষ্ট। কখনো কখনো এমন ছোট্ট একটি গল্পই শিশুর চিন্তাভাবনা ও আচরণে ইতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে।

সম্বোধন ও কথার ধরন: তিয়াশার আচরণের যে দিকটা সবাই আগে লক্ষ্য করে

একটা বিষয় আমি পারুলের বাসায় গেলে প্রায়ই লক্ষ্য করি, আর সত্যি বলতে বেশ ভালোও লাগে। তিয়াশা কখনো কোনো বড়কে শুধু নাম ধরে ডাকে না। তার মুখে সবসময় “খালা”, “চাচা”, “দাদু” কিংবা “নানু” এ ধরনের সম্মানসূচক সম্বোধনই শোনা যায়। ব্যাপারটা তার কাছে এতটাই স্বাভাবিক যে মনে হয়, যেন ছোটবেলা থেকেই সে এভাবেই বড় হয়েছে।

বয়োজ্যেষ্ঠদের মধ্যে মা-বাবা, বড় ভাই-বোন, দাদা-দাদি, নানা-নানি, খালা-খালু, ফুফু-ফুফা, চাচা-চাচি, মামা-মামি সবাই শ্রদ্ধার পাত্র। এছাড়া শিক্ষক, পাড়া-প্রতিবেশী যারা বয়সে বড়, তাঁদের প্রতি শ্রদ্ধা ও সম্মান প্রদর্শন করা উচিত। পারুল এই তালিকাটা তিয়াশার মাথায় গেঁথে দিয়েছে একেবারে ছোটবেলা থেকেই।

সততার সঙ্গে বলছি, “সম্বোধন” বিষয়টা নিয়ে অনেক অভিভাবকই দ্বিধায় থাকেন। কোথা থেকে শুরু করবেন, কীভাবে শেখাবেন সেটা বুঝে উঠতে পারেন না। কিন্তু পারুলের পদ্ধতিটা আশ্চর্য রকম সহজ। নতুন কেউ বাড়িতে এলেই সে তিয়াশাকে জিজ্ঞেস করে, “আচ্ছা, উনাকে তুমি কী বলে ডাকবে?” তারপর প্রয়োজন হলে নিজেই বলে দেয়। এভাবে বারবার শুনতে শুনতে তিয়াশা ধীরে ধীরে শিখে গেছে কাকে কী বলে সম্বোধন করতে হয়। কোনো চাপ নেই, কোনো আলাদা ক্লাস নেই শুধু দৈনন্দিন জীবনের মধ্যেই শেখার সুযোগ।

শিশুর অনুভূতিকে গুরুত্ব দেওয়ার পাশাপাশি নিজের মূল্যবোধ ও অন্যদের প্রতি সম্মান কীভাবে প্রকাশ করতে হয়, সেটাও মা-বাবা নিজেদের আচরণের মাধ্যমে শেখাতে পারেন। এভাবেই ধীরে ধীরে শিশুর মধ্যে দয়া, উদারতা, সহমর্মিতা ও আত্মবিশ্বাসের মতো গুণগুলো গড়ে ওঠে। পারুল এই বিষয়টিতে দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করে। আর তার সেই বিশ্বাসের ফল যে কতটা ইতিবাচক হতে পারে, তিয়াশার আচরণ দেখলেই তা বোঝা যায়।

আপনার সন্তান যদি সম্বোধন নিয়ে প্রায়ই দ্বিধায় পড়ে, তাহলে একটি সহজ উপায় চেষ্টা করে দেখতে পারেন। পরিচিত মানুষদের নাম ও তাদের সম্পর্ক লিখে একটি ছোট তালিকা তৈরি করুন। তারপর প্রতিদিন কয়েক মিনিট সময় নিয়ে সন্তানের সঙ্গে সেটি দেখে নিন। নিয়মিত চর্চার মাধ্যমে শিশুরা খুব দ্রুত শিখে ফেলে, আর অল্প কিছুদিনের মধ্যেই সঠিক সম্বোধন ব্যবহার করা তাদের স্বাভাবিক অভ্যাসে পরিণত হয়।

শিশুর প্রশ্নের প্রতি সম্মান: পারুল যে ভুলটা করে না

এই বিষয়টা নিয়ে খুব বেশি আলোচনা হয় না। অথচ আমার মনে হয়, বিষয়টি নতুন করে ভাবার সময় এসেছে। পারুল তিয়াশাকে শুধু নিয়ম শেখায় না, তার প্রশ্নগুলোকেও গুরুত্ব দেয়। তিয়াশা যখন জানতে চায়, “মা, বড়দের সালাম কেন দিতে হয়?”, তখন পারুল তাকে থামিয়ে দেয় না বা বলে না, “চুপ কর, এত প্রশ্ন করতে নেই।” বরং ধৈর্য নিয়ে তার কৌতূহলের উত্তর দেওয়ার চেষ্টা করে। কারণ সে জানে, প্রশ্ন করা শেখারই একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ।

শিশুদের মনে সব সময়ই নানা প্রশ্ন ঘুরপাক খায়। এই বয়সে তাদের জানার আগ্রহ থাকে প্রবল, আর সেই কৌতূহলই তাদের শেখার পথ খুলে দেয়। তাই সন্তান যেন নির্ভয়ে প্রশ্ন করতে পারে, এমন একটি পরিবেশ তৈরি করা খুব গুরুত্বপূর্ণ। তাদের বুঝতে হবে, কোনো কিছু জানতে চাইলে মা-বাবার কাছেই সবচেয়ে সহজে উত্তর পাওয়া যায়। পারুল ঠিক এভাবেই তিয়াশাকে বড় করছে। মেয়ের প্রতিটি “কেন” সে মন দিয়ে শোনে, ধৈর্য ধরে উত্তর দেয়। প্রশ্ন করার জন্য কখনো বকাঝকা করে না, বরং উৎসাহ দেয়।

একটা বিষয় অনেকেই গুরুত্ব দিয়ে ভাবেন না। শিশুর জীবনের প্রথম কয়েকটি বছর মূলত পরিবারকে ঘিরেই কাটে। পরে ধীরে ধীরে স্কুল, শিক্ষক, বন্ধু আর আশপাশের পরিবেশ তার চিন্তাভাবনা ও আচরণের ওপর প্রভাব ফেলতে শুরু করে। তাই পারুল জানে, তিয়াশার কৌতূহলকে সঠিকভাবে পথ দেখানোর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সময় এখনই। আজ যে প্রশ্নগুলোর উত্তর সে মায়ের কাছ থেকে খুঁজছে, কয়েক বছর পর হয়তো সেই সুযোগ আর থাকবে না। তাই সে এই সময়টাকে যত্ন করে কাজে লাগানোর চেষ্টা করে।

পারুল একদিন আমাকে বলেছিল, “তিয়াশা যখন প্রশ্ন করে, তখন আমি বুঝি ও নতুন কিছু শিখতে চাইছে। সেই মুহূর্তে ওকে থামিয়ে দেওয়া মানে শেখার একটা দরজা বন্ধ করে দেওয়া।” কথাটা শুনে আমি কিছুক্ষণ চুপ হয়ে গিয়েছিলাম। সত্যিই তো, আমরা অনেক সময় শিশুদের প্রশ্নকে বিরক্তি হিসেবে দেখি, অথচ সেগুলোই তাদের শেখার সবচেয়ে বড় মাধ্যম। কতজন মা-বাবা বিষয়টা এত গভীরভাবে ভাবেন?

আজ আপনার সন্তান যদি কোনো প্রশ্ন করে, তাহলে একটু সময় নিয়ে মনোযোগ দিয়ে শুনুন। উত্তরটা খুব জটিল হওয়ার দরকার নেই, সহজ ভাষায় বোঝানোর চেষ্টা করলেই যথেষ্ট। হয়তো এতে আপনার পাঁচ মিনিট সময় লাগবে, কিন্তু সন্তানের মনে যে আস্থা ও বিশ্বাস তৈরি হবে, তার মূল্য অনেক বেশি। ছোটবেলায় যে শিশু নিজের প্রশ্নের উত্তর মা-বাবার কাছে পায়, সে বড় হয়েও তাদের সঙ্গে খোলামেলা সম্পর্ক বজায় রাখতে পারে।

সহনশীলতা ও ধৈর্য: পারুল তিয়াশাকে যেভাবে “না” শুনতে শেখায়

সোজা কথায় বলতে গেলে, বড়দের সম্মান করা মানে শুধু সালাম দেওয়া বা ভদ্রভাবে কথা বলা নয়। এর আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো সীমাবদ্ধতা ও নিয়মকে সম্মান করতে শেখা। অর্থাৎ, কোনো বড় যখন যুক্তিসঙ্গত কারণে “না” বলেন, তখন সেটি মেনে নেওয়ার মানসিকতা গড়ে তোলা। পারুল এই বিষয়টিকে খুব গুরুত্ব দেয় এবং ধৈর্য নিয়ে তিয়াশাকে বোঝানোর চেষ্টা করে কেন সব ইচ্ছা সব সময় পূরণ হয় না।

শিশুর সামাজিক আচরণ গড়ে ওঠার পেছনে মা-বাবার ভূমিকা অনেক বড়। তাদের কাছ থেকেই শিশুরা শিখে কীভাবে অন্যের কথা শুনতে হয়, নিজের ভাবনা প্রকাশ করতে হয় এবং কৃতজ্ঞতা দেখাতে হয়। ধীরে ধীরে তাদের মধ্যে ন্যায়-অন্যায়ের বোধও তৈরি হয়। পারুল প্রতিদিন ছোট ছোট ঘটনার মাধ্যমে তিয়াশাকে এসব বিষয় বোঝানোর চেষ্টা করে। যেমন, তিয়াশা কখনো মন খারাপ করলে সে বলে, “দাদু যদি এখন তোমার সঙ্গে কথা বলতে না পারেন, তার মানে এই নয় যে তিনি তোমাকে ভালোবাসেন না। হয়তো তিনি কোনো কাজে ব্যস্ত আছেন।” এভাবেই সে মেয়েকে অন্যের অবস্থান বুঝতে এবং পরিস্থিতিকে ইতিবাচকভাবে দেখতে শেখায়।

হ্যাঁ, বিষয়টা শেখানো সহজ নয়। কিন্তু পারুল এর জন্য একটি সহজ ও কার্যকর পদ্ধতি খুঁজে পেয়েছে। সে তিয়াশাকে বলে, “কেউ যদি ব্যস্ত থাকে, তাহলে একটু অপেক্ষা করো। পরে সুযোগ বুঝে তোমার কথা বলবে।” ধীরে ধীরে এই ছোট্ট অভ্যাসই তিয়াশাকে ধৈর্য ধরতে এবং অন্যের পরিস্থিতি বুঝতে সাহায্য করছে।

আসলে, শিশুদের শুধু ভদ্র ব্যবহার শেখালেই হয় না, তাদের সমাজের সঙ্গে মানিয়ে চলার দক্ষতাও গড়ে তুলতে হয়। অন্যের কথা শোনা, নিজের পালার জন্য অপেক্ষা করা, পারস্পরিক সম্মান বজায় রাখা এসবই সামাজিক জীবনের গুরুত্বপূর্ণ অংশ। ছোটবেলা থেকেই এসব গুণের চর্চা হলে শিশু বড় হয়ে চারপাশের মানুষের সঙ্গে আরও সুন্দর ও ইতিবাচক সম্পর্ক গড়ে তুলতে পারে।

নিচের ছকে পারুলের প্রধান শিক্ষণ পদ্ধতিগুলো তুলনামূলকভাবে দেখানো হলো:

পদ্ধতি কীভাবে করে ফলাফল
ঘরে অভিনয়ভিত্তিক অনুশীলন প্রতি সন্ধ্যায় ৫-১০ মিনিট বাইরে অস্বস্তি কমে
গল্পের মাধ্যমে শিক্ষা ঘুমানোর আগে রাতে মনে গেঁথে যায়
সম্বোধন চর্চা নতুন মানুষ এলে আত্মবিশ্বাস বাড়ে
প্রশ্নের উত্তর দেওয়া সন্তানের প্রতিটা “কেন”-এ বিশ্বাসযোগ্যতা তৈরি হয়
ধৈর্যের অনুশীলন প্রতিদিনের ছোট ঘটনায় সহনশীলতা গড়ে ওঠে

ব্যক্তিগতভাবে আমি পারুলের ধৈর্য ও বোঝানোর পদ্ধতিকেই বেশি কার্যকর মনে করি। কারণ কঠোর শাস্তি বা ভয় দেখিয়ে শেখানোর চেয়ে ধৈর্য, সংলাপ এবং ইতিবাচক দিকনির্দেশনা শিশুদের ওপর অনেক ভালো প্রভাব ফেলে। এতে শিশুরা শুধু নিয়ম মানতে শেখে না, বরং সেই নিয়মের কারণও বুঝতে পারে। পারুলও কখনো ভয় বা শাস্তিকে প্রধান হাতিয়ার বানায়নি। বরং সে বিশ্বাস করে, সম্মান, ধৈর্য এবং ভালোবাসার মাধ্যমে শেখানো শিক্ষাই সবচেয়ে দীর্ঘস্থায়ী হয়।

সন্তানকে ধৈর্য শেখাতে চাইলে প্রথমে সেই ধৈর্যের চর্চা করতে হবে মা-বাবাকেই। পরের বার সে কোনো বায়না ধরলে সঙ্গে সঙ্গে রাগ বা শাস্তির আশ্রয় না নিয়ে শান্তভাবে বলুন, “একটু অপেক্ষা করো, তারপর দেখি।” এমন ছোট ছোট মুহূর্ত থেকেই শিশুরা অপেক্ষা করা, নিজের আবেগ নিয়ন্ত্রণ করা এবং ধৈর্য ধরার গুরুত্ব শিখতে শুরু করে। অনেক সময় একটি সাধারণ বাক্যই বড় একটি শিক্ষার ভিত্তি হয়ে উঠতে পারে।

নিজে করে দেখানো: পারুলের সবচেয়ে কার্যকর শিক্ষার পদ্ধতি

আমি যখন পারুলকে অন্য অনেক অভিভাবকের সঙ্গে তুলনা করি, তখন একটি বিষয়ই সবচেয়ে বেশি চোখে পড়ে। অনেকেই সন্তানকে কী করতে হবে তা বলে দেন, কিন্তু পারুল আগে নিজেই করে দেখায়। শুনতে পার্থক্যটা ছোট মনে হলেও বাস্তবে এর প্রভাব অনেক বড়। কারণ শিশুরা কথার চেয়ে আচরণ থেকেই বেশি শেখে। তাই পারুলের শিক্ষা শুধু উপদেশে সীমাবদ্ধ থাকে না, সেটা প্রতিদিনের কাজের মধ্যেই ফুটে ওঠে।

পারুল যখনই প্রতিবেশীর বাড়িতে যায়, তিয়াশার সামনেই আগে সালাম দেয়। বাজারে কিছু কিনলে দোকানদারকে ধন্যবাদ জানায়। কোথাও কোনো বয়স্ক মানুষকে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখলে নিজের আসন ছেড়ে দিতে দ্বিধা করে না। তিয়াশা এসব দৃশ্য নীরবে দেখে। তাকে আলাদা করে কিছু বলতে হয় না, বড় কোনো বক্তৃতাও দিতে হয় না। সে শুধু দেখে, শেখে এবং ধীরে ধীরে সেই আচরণগুলো নিজের মধ্যেও গড়ে তোলে। আসল শিক্ষা অনেক সময় ঠিক এভাবেই হয়।

শিশুদের বিভিন্ন সামাজিক পরিস্থিতিতে স্বাচ্ছন্দ্যের সঙ্গে মানিয়ে চলতে শেখাতে হলে প্রস্তুতিটা শুরু করতে হয় ঘর থেকেই। ছোটবেলা থেকে যদি তারা ভদ্র আচরণ, যোগাযোগের নিয়ম এবং সামাজিক পরিবেশ সম্পর্কে ধারণা পায়, তাহলে বাইরে গিয়ে নতুন পরিস্থিতির মুখোমুখি হলেও তারা সহজে অস্বস্তিতে পড়ে না। পারুল এই বিষয়টিতে বিশ্বাস করে। তাই সে তিয়াশাকে ঘরের মধ্যেই নানা বাস্তব পরিস্থিতির জন্য প্রস্তুত করে। এর ফল হলো, বাড়ির বাইরে গেলেও তিয়াশা আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে মানুষের সঙ্গে মিশতে পারে এবং নতুন পরিবেশে নিজেকে সহজে মানিয়ে নিতে পারে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, সামাজিক যোগাযোগের অন্যতম প্রথম ধাপ হলো মানুষকে সঠিকভাবে সম্বোধন করা। আর এই অভ্যাসের শুরু হয় পরিবার থেকেই। শিশুরা প্রতিদিনের জীবনে মা-বাবার কথা, আচরণ এবং সম্বোধনের ধরন দেখে শিখে যায় কাকে কীভাবে ডাকতে হয়। পারুলও এই বিষয়টিকে গুরুত্ব দেয়। সে জানে, ভদ্র ও যথাযথ সম্বোধনের অভ্যাস একদিনে তৈরি হয় না; এটি গড়ে ওঠে প্রতিদিনের ছোট ছোট চর্চার মাধ্যমে।

একজন মানুষের সুন্দর আচরণ শুধু অন্যকে সম্মানিত করে না, তাকে নিজেকেও সম্মানিত করে তোলে। আর একটি শিশুর ভদ্র ব্যবহার ও সুন্দর আচার-আচরণ অনেকটাই তার পারিবারিক শিক্ষা ও বেড়ে ওঠার পরিবেশের প্রতিফলন। তাই পারুল যখন তিয়াশাকে নিয়ে কোথাও যায়, মানুষ শুধু তিয়াশার ভদ্রতা দেখে মুগ্ধ হয় না, সেই প্রশংসার একটি বড় অংশ পারুলের দিকেও যায়। কারণ সবাই বুঝতে পারে, এমন আচরণের পেছনে রয়েছে পরিবারের যত্ন, সময় এবং সঠিক দিকনির্দেশনা।

অনেক অভিভাবকই বলেন, “আমি চাই আমার সন্তান একজন ভালো মানুষ হোক।” কিন্তু বাস্তবে শিশুরা মা-বাবার কথার চেয়ে তাদের আচরণ থেকেই বেশি শিক্ষা নেয়। তাই শুধু উপদেশ দিলেই হয় না, সেই মূল্যবোধগুলো নিজের জীবনেও চর্চা করতে হয়। এখানেই পারুলের পদ্ধতিটা আলাদা। সে শুধু কী করতে হবে তা বলে না, নিজেও সেটার উদাহরণ তৈরি করে। আর এ কারণেই তার শেখানো বিষয়গুলো তিয়াশার কাছে বেশি স্বাভাবিক ও গ্রহণযোগ্য হয়ে ওঠে। কথার সঙ্গে কাজের মিল থাকলে শিক্ষার প্রভাবও অনেক গভীর হয়।

আমি ব্যক্তিগতভাবে একটি খুব সহজ নিয়মে বিশ্বাস করি সন্তানকে যা শেখাতে চান, আগে নিজেই সেটা করে দেখান। কারণ শিশুরা উপদেশের চেয়ে উদাহরণ থেকে অনেক বেশি শেখে। তাই পরের বার কোনো বড় মানুষের সঙ্গে কথা বলার সময় সন্তানকে পাশে রাখুন। তাকে দেখান কীভাবে সম্মান রেখে কথা বলতে হয়, কীভাবে মনোযোগ দিয়ে অন্যের কথা শুনতে হয় এবং কীভাবে ভদ্র আচরণ করতে হয়। অনেক সময় এমন সাধারণ মুহূর্তগুলোই শিশুর জন্য সবচেয়ে কার্যকর শিক্ষা হয়ে ওঠে।

শেষ কথা

পারুলের পদ্ধতিতে আসলে কোনো জাদু নেই। নেই কোনো কঠিন নিয়ম বা ব্যয়বহুল প্রশিক্ষণ। আছে শুধু ধারাবাহিকতা, ভালোবাসা এবং সন্তানের জন্য নিজেই একটি ভালো উদাহরণ হওয়ার আন্তরিক চেষ্টা। শিশুর মানসিক ও সামাজিক বিকাশ কেবল বই পড়ে বা উপদেশ শুনে হয় না; এটি গড়ে ওঠে প্রতিদিনের আচরণ, সম্পর্ক এবং পারিবারিক পরিবেশের মাধ্যমে।

পারুলের গল্প আমাদের একটি সহজ সত্য মনে করিয়ে দেয় শিশুরা আমাদের কথা যতটা না শোনে, তার চেয়ে অনেক বেশি আমাদের কাজ দেখে শেখে। তাই আপনি যদি চান আপনার সন্তান বড়দের সম্মান করুক, ভদ্র আচরণ করুক এবং একজন মানবিক মানুষ হিসেবে বেড়ে উঠুক, তাহলে সেই শিক্ষার শুরুটা আপনাকেই করতে হবে।

আজ থেকেই একটি ছোট্ট অভ্যাস গড়ে তুলুন। সন্তানের সামনে প্রতিদিন অন্তত একবার কাউকে সম্মান দেখান, কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করুন বা ভদ্র আচরণের উদাহরণ তৈরি করুন। হয়তো আপনি বুঝতেও পারবেন না কখন সেই ছোট্ট দৃশ্যগুলো আপনার সন্তানের চরিত্র গঠনের ভিত্তি হয়ে উঠেছে।

নুসরাত জাহান রিমা

নুসরাত জাহান রিমা একজন গৃহিণী ও অভিভাবক ব্লগার, যিনি ঢাকায় বসবাস করেন। নিজের সন্তানের প্রি-স্কুলে ভর্তি ও প্রাথমিক শিক্ষাজীবনের বাস্তব অভিজ্ঞতা থেকে তিনি নিয়মিত তথ্যভিত্তিক ও সহায়ক লেখা প্রকাশ করেন। পাশাপাশি অন্যান্য অভিভাবকদের অভিজ্ঞতা ও পরামর্শও তিনি তাঁর ব্লগে তুলে ধরেন, যাতে নতুন অভিভাবকেরা সহজে সঠিক সিদ্ধান্ত নিতে পারেন।

এই মুহূর্তে অন্যরা যা পড়ছে

Leave a Comment