সেই সকালটার কথা এখনো মনে আছে। আমাদের মেয়ে রাইসা স্কুলের ব্যাগ দেখলেই পেটে ব্যথার অজুহাত দিত। প্রতিদিন। বিরতিহীনভাবে। প্রথম কয়েক সপ্তাহ ভেবেছিলাম কোনো শারীরিক সমস্যা হয়েছে। ডাক্তার দেখালাম, পরীক্ষা করালাম। ফলাফল? একদম স্বাভাবিক। তখনই বুঝলাম, আসল সমস্যাটা অন্য জায়গায়। আমি আর আমার স্বামী সেদিন থেকে একসাথে এই পথ পার হয়েছি। আজকে সেই গল্পটাই বলব।
স্কুলভীতি আসলে কী, আর কতটা সাধারণ এই সমস্যা
বেশিরভাগ মা-বাবা ভাবেন বাচ্চার স্কুল না যাওয়া মানে দুষ্টুমি বা পড়াশোনার অনীহা। আমিও একসময় এটাই ভাবতাম। কিন্তু বাস্তবতাটা সম্পূর্ণ আলাদা।
স্কুলে যেতে না চাওয়া, ব্যাখ্যাতীত ভয়, ঘর ছেড়ে যেতে অনর্থক উদ্বেগ, মায়ের কাছ থেকে না যেতে চাওয়া এগুলোকে স্কুলভীতি বা স্কুল ফোবিয়া হিসেবে চিহ্নিত করা হয়। এই অবস্থায় শিশু বাসায় থাকতে চায়, স্কুলে যেতে চায় না। অনেক সময় লম্বা ছুটির পরে এই সমস্যা নতুন করে দেখা দেয়।
অবাক লাগলো। এত সাধারণ একটা সমস্যা, অথচ কেউ খোলামেলা কথা বলে না এটা নিয়ে।
বিশ্বব্যাপী পরিসংখ্যান বলছে, স্কুলভীতি মোট শিক্ষার্থীর প্রায় ১ শতাংশকে প্রভাবিত করে এবং শিশু মানসিক স্বাস্থ্য পরামর্শের প্রায় ৫ শতাংশ ক্ষেত্রে এটি মূল কারণ। আর গবেষণায় দেখা গেছে, ২ থেকে ৫ শতাংশ শিশু কোনো না কোনো সময় স্কুল ফোবিয়ায় ভোগে। তার মানে শুধু আমাদের মেয়ে নয়, লাখো পরিবার এই পথ পার হয়।
এটি শুধু মাঝেমধ্যে ক্লাসে যেতে না চাওয়া নয়, এটি প্রকৃত মানসিক যন্ত্রণা, উদ্বেগ বা ভয় থেকে জন্ম নেওয়া একটি স্থায়ী সংগ্রাম।
ব্যক্তিগতভাবে বলছি, রাইসার ক্ষেত্রে সমস্যাটা বোঝার আগে আমরা দুজনেই অনেক সময় নষ্ট করেছি। আমার স্বামী চাইতেন জোর করে পাঠাতে। আমি পারতাম না। সেই দ্বন্দ্বটাই প্রথমে সমাধানের পথে সবচেয়ে বড় বাধা ছিল।
পরামর্শঃ আপনার সন্তান যদি স্কুলের সকালে নিয়মিত শারীরিক অসুস্থতার কথা বলে, কিন্তু ছুটির দিনে একদম সুস্থ থাকে, তাহলে আজই একজন শিশু মনোবিদের সাথে একটা প্রাথমিক পরামর্শ নিন। মাত্র একটা ফোনকলেই শুরু হতে পারে সমাধানের যাত্রা।
যে কারণগুলো আমরা প্রথমে বুঝতেই পারিনি
সততার সাথে বলছি, কারণ খোঁজার পর্বটা আমার জন্য সবচেয়ে কঠিন ছিল। কারণ বাচ্চা সরাসরি বলে না। তারা বলে পেটে ব্যথা, মাথায় ব্যথা।
পড়াশোনার অতিরিক্ত চাপ, প্রতিদিন পরীক্ষা, খেলাধুলা বা বিনোদনের ব্যবস্থা কম থাকা, কঠিন শাস্তির ব্যবস্থা, সবার সামনে অপমান এগুলো শিশুর সংবেদনশীল মনে স্কুলের প্রতি অনীহা তৈরি করতে পারে। শুধু পড়ালেখায় অনাগ্রহই একমাত্র কারণ নয়।
স্কুলে বুলিং, কোনো কঠোর শিক্ষক বা পড়াশোনার অতিরিক্ত চাপ শিশুর মনে ভীতির সৃষ্টি করে। কিশোর বয়সে বন্ধুরা কী ভাবছে বা ক্লাসে পারফর্ম করতে না পারার ভয় থেকেও স্কুলে যেতে না চাওয়ার প্রবণতা তৈরি হয়।
আচ্ছা ধরুন, আপনার বাচ্চা একদিন ক্লাসে ভুল উত্তর দিয়েছে, বন্ধুরা হেসেছে। এটা আপনার কাছে ছোট ঘটনা। তার কাছে? বিশাল আঘাত।
গবেষণায় দেখা গেছে, স্কুলভীতির সাথে উদ্বেগ এবং শেখার প্রতিবন্ধকতার সম্পর্ক রয়েছে। পরিবেশগত কারণের মধ্যে বুলিং ও শিশু নির্যাতন এই আচরণের সাথে সবচেয়ে বেশি যুক্ত।
আমাদের ক্ষেত্রে কারণটা ছিল মূলত একটা বিশেষ শিক্ষকের কঠোর আচরণ এবং সহপাঠীদের একটা ছোট দলের উপহাস। রাইসা বলেনি প্রথমে। আমরা জিজ্ঞেস করতাম, সে এড়িয়ে যেত। তখন আমার স্বামী একটা কাজ করলেন যেটা চমৎকার কাজে এসেছিল। থাক, সেটা পরের অংশে বলব।
অনেক শিশু তাদের মা-বাবার কাছ থেকে দূরে থাকার ভয়ে স্কুলে যেতে চায় না। হঠাৎ করে সম্পূর্ণ অচেনা একটা পরিবেশে অনেকক্ষণ সময় অতিবাহিত করতে হলে সে স্বাভাবিকভাবেই ঘাবড়ে যায়।
আপনার জন্য একটা কাজ: আজ রাতে বাচ্চার সাথে স্কুলের গল্প করুন, প্রশ্ন নয়। নিজে বলুন আপনার ছোটবেলার স্কুলের একটা মজার বা ভয়ের গল্প। দেখবেন সেও খুলতে শুরু করবে। এই কৌশলটা পাঁচ মিনিটের কাজ।
আমার স্বামী যেভাবে প্রথম বরফ ভাঙলেন
বেশিরভাগ লেখায় বলা হয় বাবার চেয়ে মা এই সমস্যায় বেশি কার্যকর ভূমিকা রাখেন। আমি একমত নই। আমাদের ক্ষেত্রে একদম উল্টো হয়েছিল।
আমার স্বামী একদিন সকালে রাইসাকে স্কুলে না পাঠিয়ে দুজনে মিলে রিকশায় চড়ে বাজারে গেলেন। কোনো পড়ার কথা নেই, কোনো স্কুলের কথা নেই। শুধু একসাথে ঘুরলেন। ফেরার পথে রাইসা নিজেই বলল, “বাবা, ক্লাসে মিতু আমাকে বোকা বলে।”
সত্যিই। একটা হাঁটাচলার সেশন যা পারল, দশটা জিজ্ঞাসাবাদ তা পারেনি।
উল্লেখযোগ্য একটি তথ্য হলো, বিচ্ছিন্নতার উদ্বেগে আক্রান্ত তিন-চতুর্থাংশ শিশু স্কুলভীতির শিকার হয়, যা এই দুটি বিষয়ের মধ্যে সম্পর্ককে বিশেষভাবে প্রাসঙ্গিক করে তোলে। তার মানে বাবা-মার সাথে সম্পর্কের গুণগত মান সরাসরি এই সমস্যার সাথে জড়িত।
আমার স্বামী এরপর থেকে প্রতি সপ্তাহে একটা “বাবা-মেয়ে সময়” রাখতেন। শুধু দুজন। কোনো লক্ষ্য নেই, কোনো পড়ার চাপ নেই। শুধু কথা বলা। এই সময়টাতেই রাইসা ধীরে ধীরে মনের ভেতরের ভয়গুলো বের করত।
স্কুল ফোবিয়া কাটিয়ে উঠতে জোরজবরদস্তি নয়, প্রয়োজন সহমর্মিতা দেখানো। শিশুর ভয়ের কথা মন দিয়ে শুনুন, তাকে বকাঝকা না করে আশ্বস্ত করুন যে আপনি তার পাশে আছেন।
জানেন, এই “পাশে আছি” কথাটা বলা এবং সত্যিই পাশে থাকার মধ্যে অনেক তফাৎ। শিশুরা সেই পার্থক্যটা টের পায়।
অনেক বাচ্চা যখন চ্যালেঞ্জ বা সমস্যার সম্মুখীন হয়, তখন নিজের নেতিবাচক মেজাজ সমন্বয় করতে পারে না। নিজের বা অন্যের প্রতি রাগ বা অসন্তোষ প্রকাশ করতে অভ্যস্ত হয়ে ওঠে, যা মানসিক স্বাস্থ্যের জন্য ক্ষতিকর। সেই জায়গায় বাবার শান্ত উপস্থিতি একটা নিরাময়ের কাজ করে।
আমি যে সহজ নিয়মটা মেনে চলি: প্রতিদিন রাতে ঘুমানোর আগে বাচ্চাকে একটাই প্রশ্ন করুন “আজকে কোনটা ভালো লাগল?” ভয়ের কথা জিজ্ঞেস করবেন না, ভালো লাগার কথা জানতে চান। আস্তে আস্তে খারাপ লাগার গল্পও বেরিয়ে আসবে।
স্কুলের সাথে যোগাযোগ এবং শিক্ষকদের সাথে সমন্বয় করার ধাপ
এই অংশটা নিয়ে আমি নিজেও শুরুতে নিশ্চিত ছিলাম না। শিক্ষকের কাছে যাব? লজ্জা লাগে তো। কিন্তু না গেলে সমাধান হবে না।
স্কুলে বাচ্চার কী সমস্যা হচ্ছে তা ঘরে বসে জানতে পারবেন না। তাই স্কুলের শিক্ষকদের সাথে কথা বলে সাহায্য নিন। এই পরামর্শটা পড়েছিলাম এবং কাজে লেগেছে।
আমি এবং আমার স্বামী একসাথে ক্লাস টিচারের সাথে দেখা করলাম। সরাসরি বললাম, রাইসার কী হচ্ছে। শিক্ষক অবাক হলেন, কারণ ক্লাসে রাইসা সবসময় চুপচাপ থাকত। সমস্যাটা তাঁর চোখেও পড়েনি।
এরপর যা হলো সেটা বিস্ময়কর। শিক্ষক রাইসাকে একটা ছোট দায়িত্ব দিলেন ক্লাসের বই বিতরণের কাজ। এটা কিছুই না মনে হয়। তবুও এই ছোট “পদ” রাইসার মনে একটা আত্মবিশ্বাস তৈরি করল।
বাচ্চার আত্মবিশ্বাস কীভাবে বাড়ানো যায়, সেদিকে পিতামাতা খেয়াল রাখতে পারেন। এমন ছোটখাটো সমস্যা সমাধানের জন্য তাদের বলা যেতে পারে যা বাচ্চা সহজে সমাধান করতে পারবে। তখন পিতামাতা তার প্রশংসা করলে ধীরে ধীরে বাচ্চা বড় সমস্যা সমাধানের যোগ্যতাও অর্জন করে।
হ্যাঁ, একদম সত্যি।
এক দিনে দীর্ঘ সময় স্কুলে না রেখে শুরুতে এক-দুই ঘণ্টার জন্য স্কুলে পাঠান। ধীরে ধীরে সময় বাড়ান। শিক্ষকের সাথে কথা বলুন যাতে স্কুলে শিশুটি নিজেকে নিরাপদ মনে করে।
আমরা ঠিক এই পদ্ধতিটাই নিয়েছিলাম। প্রথম সপ্তাহে রাইসাকে শুধু সকালের ক্লাস করাতাম, তারপর আমার স্বামী নিয়ে আসতেন। দ্বিতীয় সপ্তাহে পুরো দিন। তৃতীয় সপ্তাহে নিজেই থাকতে চাইল।
| সপ্তাহ | কী করা হয়েছিল | ফলাফল |
|---|---|---|
| প্রথম সপ্তাহ | শুধু সকালের ক্লাস, তারপর বাড়ি | অল্প উদ্বেগ, তবে সাড়া দিচ্ছে |
| দ্বিতীয় সপ্তাহ | পুরো দিন স্কুল, শিক্ষকের বিশেষ মনোযোগ | প্রতিদিন একটু বেশি স্বাভাবিক |
| তৃতীয় সপ্তাহ | রাইসা নিজে থেকে ব্যাগ গুছিয়ে রাখছে | স্কুলভীতি প্রায় শেষ |
| চতুর্থ সপ্তাহ | বন্ধুর সাথে টিফিনে খেলার পরিকল্পনা নিজে করছে | সম্পূর্ণ স্বাভাবিক রুটিনে ফিরে আসা |
এই বিষয়ে একটা কাজ এখনই করুন: স্কুলের শিক্ষকের সাথে একটা বৈঠক নির্ধারণ করুন, তবে বাচ্চাকে না জানিয়ে। আগে পরিস্থিতি বুঝুন, তারপর পদক্ষেপ নিন। এই মিটিং আধঘণ্টার বেশি লাগবে না।
ঘরের পরিবেশ ও রুটিন বদলে যেভাবে মানসিক শক্তি ফিরিয়ে দিলাম
সোজা কথায়, ঘরের পরিবেশটাও একটা বড় ভূমিকা রাখে। এটা অনেকে বলে না। কিন্তু আমি আর আমার স্বামী যখন তুলনা করলাম, লক্ষ্য করলাম রাইসার স্কুলভীতি সবচেয়ে বাড়ত যখন আমাদের মধ্যে কোনো মতবিরোধ হতো।
সাম্প্রতিক গবেষণায় স্কুলভীতির সাথে পারিবারিক বিচ্ছেদ, গৃহকলহ এবং বাবা-মার মানসিক অসুস্থতার সম্পর্ক খুঁজে পাওয়া গেছে। এটা জানার পর থেকে আমরা সচেতনভাবে বাড়িতে শান্ত পরিবেশ রাখার চেষ্টা করেছি।
আসলে, একটু অন্যভাবে বলা দরকার। শুধু ঝগড়া না করাই যথেষ্ট নয়। বাচ্চার সামনে ইতিবাচক কথোপকথন হওয়াটাও জরুরি।
গবেষণা প্রমাণ করেছে যে উদ্বেগ মূলত একটি এড়িয়ে চলার রোগ স্বল্পমেয়াদে স্বস্তি দিলেও দীর্ঘমেয়াদে এড়িয়ে চলা উদ্বেগ আরও বাড়িয়ে দেয়। তার মানে রাইসাকে স্কুল থেকে ছাড় দেওয়া যত বেশি হত, সমস্যা তত জটিল হয়ে যেত।
আমরা তাই একটা নতুন সকালের রুটিন তৈরি করলাম। ঘুম থেকে ওঠার পর কোনো স্কুলের কথা নেই প্রথম ১৫ মিনিট। পছন্দের গান, হালকা নাস্তা, একসাথে বসা। এই ছোট পরিবর্তনটা অনেক বড় প্রভাব ফেলেছিল।
স্কুলের নিয়মশৃঙ্খলা ভেঙে যাওয়া, সহপাঠীদের সাথে মেলামেশা কমে যাওয়া এবং সামাজিক বিচ্ছিন্নতা উদ্বেগ ও বিষণ্নতার উচ্চ হারে অবদান রাখে। এই জন্যই রুটিন ধরে রাখাটা এত অপরিহার্য।
আমার স্বামী রাইসার জন্য একটা ছোট “সাফল্যের তালিকা” তৈরি করেছিলেন দেয়ালে। প্রতিদিন স্কুলে গেলে একটা তারা। সাত দিনে সাতটা তারা হলে শুক্রবারে সিনেমা। সরল পুরস্কার পদ্ধতি। কিন্তু কাজ করেছিল অসাধারণভাবে।
যদি নতুন রুটিন শুরু করতে চান, তাহলে আজ রাতেই পরিবারের সবাই মিলে বসে পরের সপ্তাহের সকালের সময়সূচি ঠিক করুন। বাচ্চাকেও সেই আলোচনায় রাখুন। নিজেই সিদ্ধান্তে অংশ নিলে সে সেটা মানতে বেশি আগ্রহী হবে।
কখন বিশেষজ্ঞের সাহায্য নেওয়া অপরিহার্য হয়ে ওঠে
আমি আর আমার স্বামী যখন সব পদ্ধতি চেষ্টা করছিলাম, একটা প্রশ্ন মাথায় আসত। কতদিন নিজেরা চেষ্টা করব? কখন থামব?
দেখুন না, এই প্রশ্নটার উত্তর অনেক পরিবারের জন্য জরুরি।
বাচ্চারা যখন পড়াশোনায় অনাগ্রহী হয়, তখন এমন সমস্যা দেখা দেয় যার সমাধানে অনেক সময় চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া জরুরি। সময়মতো ব্যবস্থা গ্রহণ না করলে সমস্যা আরও জটিল আকার ধারণ করতে পারে।
স্কুলভীতি বিভিন্ন মানসিক রোগের মূল লক্ষণ হতে পারে। এর মধ্যে সামাজিক উদ্বেগজনিত সমস্যা, সাধারণ উদ্বেগজনিত সমস্যা, নির্দ্রা ও আচরণগত সমস্যা অন্তর্ভুক্ত থাকতে পারে। স্কুলভীতি সামাজিক উদ্বেগজনিত সমস্যা, সাধারণ উদ্বেগজনিত সমস্যা, নির্দিষ্ট ফোবিয়া, বড় ধরনের বিষণ্নতা, বিরোধী আচরণের সমস্যা এবং এমনকি পোস্ট-ট্রমাটিক স্ট্রেস ডিসঅর্ডারের সাথেও যুক্ত থাকতে পারে।
যদি এক সপ্তাহেরও বেশি সময় ধরে বাচ্চার স্কুলে যাওয়ার সমস্যা সামলাতে না পারেন, তাহলে শিশুর চিকিৎসকের সাথে কথা বলুন। এটাই সেই সীমারেখা যেখান থেকে পেশাদার সাহায্য নেওয়া শুরু করতে হবে।
মানসিক স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞের সাহায্য নেওয়া জরুরি যখন শিশুর উদ্বেগ দৈনন্দিন জীবনে উল্লেখযোগ্য সমস্যা তৈরি করছে, কারণ চিকিৎসা না করা উদ্বেগ পরবর্তীতে বিষণ্নতা, মাদকাসক্তি এবং সামাজিক বিচ্ছিন্নতার দিকে নিয়ে যেতে পারে।
চিকিৎসার বিকল্পগুলোর মধ্যে রয়েছে কগনিটিভ বিহেভিয়ার থেরাপি, শিক্ষামূলক সহায়তা থেরাপি, ওষুধ প্রয়োগ এবং অভিভাবক-শিক্ষক হস্তক্ষেপ। কগনিটিভ বিহেভিয়ার থেরাপি বা সিবিটি শিশুদের অসহায়কারী চিন্তার ধরন চিহ্নিত করতে এবং পরিবর্তন করতে শেখায়, যা তাদের ভয়ের মোকাবেলায় সাহায্য করে।
স্কুলভীতি প্রায় ২% থেকে ৫% শিশুকে প্রভাবিত করে অর্থাৎ প্রতি ২০ জনে ১ জন শিশু। এটি ৫ থেকে ৬ বছর বয়সী এবং ১০ থেকে ১১ বছর বয়সী শিশুদের মধ্যে সবচেয়ে বেশি দেখা যায়। তাই আপনার সন্তানের বয়স এই পর্যায়ে থাকলে একটু বাড়তি সতর্ক থাকুন।
স্কুল প্রত্যাখ্যানের মূল্যায়ন ও ব্যবস্থাপনায় একটি সমন্বিত পদ্ধতি প্রয়োজন, যেখানে চিকিৎসক, অভিভাবক, স্কুলের কর্মী এবং মানসিক স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ সকলে একসাথে কাজ করেন। রাইসার ক্ষেত্রেও আমরা ঠিক এই পথটাই বেছে নিয়েছিলাম স্কুলের শ্রেণিশিক্ষিকা, একজন শিশু মনোবিজ্ঞানী এবং আমরা দুজন মিলে একটা পরিকল্পনা তৈরি করেছিলাম।
শেষ কথা
স্কুলভীতি কোনো বাচ্চার দুর্বলতা নয়, কোনো পরিবারের ব্যর্থতাও নয়। এটি একটি বাস্তব সমস্যা, যা হাজারো পরিবার প্রতিদিন মোকাবেলা করছে। স্কুলে না যাওয়া শিশুর সামাজিক, মানসিক ও শিক্ষাগত বিকাশে স্বল্পমেয়াদী ও দীর্ঘমেয়াদী উভয় ক্ষতিই করে, তাই সমস্যাটি দ্রুত চিহ্নিত করে হস্তক্ষেপ করা অত্যন্ত জরুরি। যত দ্রুত আপনি পদক্ষেপ নেবেন, তত দ্রুত আপনার সন্তান স্বাভাবিক জীবনে ফিরতে পারবে।
রাইসা এখন প্রতিদিন স্কুলে যায়। সকালের সেই কান্না, পেটব্যথার অভিযোগ, দরজায় আঁকড়ে ধরা এগুলো এখন শুধুই স্মৃতি। একবার স্কুল প্রত্যাখ্যান যদি বেশ কয়েক সপ্তাহ ধরে চলতে থাকে, তারপরেও চিকিৎসার মাধ্যমে ফলাফল চমৎকার হতে পারে। তাই হাল ছেড়ে দেবেন না। ধৈর্য, ভালোবাসা আর সঠিক সহায়তা এই তিনটি জিনিস আপনার সন্তানকে ফিরিয়ে আনতে পারবে।
আপনি যদি এই লেখাটি পড়ে নিজেকে কোনো একটি ভালো মুহূর্তে খুঁজে পান, যদি মনে হয় “হ্যাঁ, এটাই আমাদের গল্প” তাহলে জানুন, আপনি একা নন। অভিভাবক, শিক্ষক এবং স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের সমন্বিত সহায়তাই পারে শিশুকে নিরাপদ, বোঝাপড়া এবং স্কুলমুখী করে তুলতে। আজই একটা ছোট পদক্ষেপ নিন। সেটাই হবে আপনার সন্তানের নতুন সকালের শুরু।










