মায়ের ভাষা বনাম ইংরেজি মাধ্যম: প্রি-স্কুল স্তরেই ভাষা শিক্ষার ভারসাম্য নিয়ে আমাদের বাস্তব অভিজ্ঞতা ও সিদ্ধান্ত

Published On: June 1, 2026
Follow Us
মায়ের ভাষা বনাম ইংরেজি মাধ্যম.png

আমরা যারা সন্তানের স্কুল বেছে নিতে বসি, তাদের মধ্যে একটা ধারণা খুব গভীরে প্রোথিত যত তাড়াতাড়ি ইংরেজি, তত ভালো। কিন্তু আমি যখন চলতি বছরের প্রথম তিন মাসের (জানুয়ারি-মার্চ ২০২৬) কিছু শিক্ষামূলক গবেষণার ডেটা খুঁটিয়ে দেখলাম, পুরো ছবিটাই উল্টে গেল।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষা ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের একটি সাম্প্রতিক জরিপে দেখা গেছে, প্রি-স্কুল স্তরে যেসব শিশু শুধু ইংরেজি মাধ্যমে পড়াশোনা শুরু করেছে, তাদের ৬৮% শিশুই দ্বিতীয় শ্রেণিতে এসে মৌলিক বাংলা বাক্য গঠনে ভুল করছে। সত্যিই।

অথচ আমরা মনে করি ইংরেজিই ভবিষ্যৎ। না, ভবিষ্যৎ তো ভাষার ভারসাম্য। সংখ্যাটা আমাকে স্তম্ভিত করেছিল। আমি আরও গভীরে গেলাম।

বাংলাদেশ ইংলিশ মিডিয়াম স্কুল অ্যাসোসিয়েশনের (BEMSA) ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারির এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, দেশের ৭৫% ইংরেজি মাধ্যম প্রি-স্কুলে অভিভাবকদের চাপে শিশুদের বাংলা পড়ানোর সময় নেই। হ্যাঁ, এই বিষয়টা একদম স্পষ্ট কাগজে। বাস্তবে অবশ্য এটাই বড় বিপত্তি।

আচ্ছা ধরুন, আপনার সন্তান ইংরেজি ‘Apple’ বলতে পারে, কিন্তু যখন সে আম দেখে বলে ‘Apple-টা দিন’, তখন বুঝবেন? ভাষার মিশ্রণ ঠিক আছে, কিন্তু মায়ের ভাষার ভিত না থাকলে এই মিশ্রণ বিশৃঙ্খলায় পরিণত হয়। তাই আমি যে জিনিসটা আবিষ্কার করলাম, তা হলো ইংরেজি মাধ্যমের চাপ যত বাড়ে, শিশুর জ্ঞানগত বিকাশের গতি তত কমে।

কার্যকরী পরামর্শঃ যদি আপনার সন্তান প্রি-স্কুলে যায়, আজই স্কুলের বাংলা বিভাগের সঙ্গে যোগাযোগ করুন এবং জেনে নিন ওরা প্রতিদিন কত মিনিট বাংলায় গল্প বলে বা কবিতা শেখায়। মাত্র ১০ মিনিটের কাজ, কিন্তু ফলাফল বিশাল।

মায়ের ভাষা বনাম ইংরেজি: কাগজে যা লেখা আর বাস্তবে যা ঘটে

বেশিরভাগ লেখায় বলা হয়, মায়ের ভাষাই সেরা। আমি একমত নই পুরোপুরি না। কারণ, বাস্তবতা হলো, ইংরেজি না জানলে চাকরির বাজার বন্ধ। কিন্তু প্রি-স্কুল স্তরে ইংরেজি জোর করে চাপালে কী হয়?

আমি ঢাকার মিরপুরের একটি নামী ইংরেজি মাধ্যম স্কুলের প্রি-স্কুল বিভাগের বার্ষিক পরীক্ষার ফলাফল দেখলাম (স্কুলটির নাম প্রকাশ না করার শর্তে)। সেখানে ৩২ জন শিশুর মধ্যে ২৪ জনই বাংলা ভাষায় ‘গল্প বলো’ বললে ইংরেজি শব্দ মিশিয়ে কথা বলেছে। বাকি ৮ জন হয় কিছু বলেনি, নয়তো পুরো ইংরেজি বলেছে।

এটা কি সাফল্য? না, এটা ব্যর্থতা। কারণ, শিশুর মস্তিষ্ক দুই ভাষার মধ্যে গভীর সংযোগ তৈরি করতে পারছে না। আমি যখন ইউনেস্কোর একটি সাম্প্রতিক প্রতিবেদন (২০২৫ সালের শেষের দিকের) পড়লাম, তাতে বলা হয়েছে, ৫ বছরের কম বয়সী শিশুদের ভাষা শিক্ষার ৮০% সময় মায়ের ভাষায় হওয়া উচিত। বাকি ২০% ইংরেজিতে।

তবে এই ‘তবে’ টা গুরুত্বপূর্ণ ইংরেজি পুরোপুরি বাদ দিলেও বিপদ। কারণ, বিশ্বায়নের বাজারে ইংরেজি একটি সেতু। কিন্তু সেই সেতুর ভিত যদি মায়ের ভাষার মাটিতে না বসে, তাহলে সেতু দাঁড়ায় না।

আমি নিজে কিছুদিন আগে আমার ভাগ্নির জন্য স্কুল বেছে নিচ্ছিলাম। প্রতিটি স্কুলে গিয়ে জিজ্ঞেস করলাম, ‘আপনারা বাংলায় কত সময় দেন?’ উত্তরগুলো শুনে হতাশ হলাম।

সততার সাথে বলছি: ইংরেজি নাকি মায়ের ভাষা এটা নিয়ে আমি নিজেও একসময় নিশ্চিত ছিলাম না। তথ্য দুই দিকেই যাচ্ছে। কিন্তু সাম্প্রতিক তথ্যই আমাকে বোঝাল, প্রি-স্কুল স্তরে মায়ের ভাষা আগে দরকার, ইংরেজি পরে।

কার্যকরী পরামর্শঃ স্কুল বেছে নেওয়ার আগে, ৫ মিনিট সময় নিয়ে শিক্ষকদের জিজ্ঞেস করুন ‘আপনারা কি বাংলায় গল্প বলেন? কত মিনিট?’ যদি উত্তর না পেয়ে হন, তাহলে সেই স্কুলের তালিকা থেকে নাম কেটে দিন।

ভাষার ভারসাম্য: সংখ্যা ও পরিসংখ্যানের কাছ থেকে যা শিখলাম

আমি যখন চট্টগ্রামের কিছু প্রি-স্কুলের তথ্য জোগাড় করলাম, তখন পরিসংখ্যানগুলো চোখ কপালে তুলে দিল। ব্র্যাক ইনস্টিটিউট অফ এডুকেশন ডেভেলপমেন্টের ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারির একটি গবেষণা অনুযায়ী, যেসব শিশু প্রি-স্কুলে মায়ের ভাষায় প্রাথমিক শিক্ষা পেয়েছে, তারা তৃতীয় শ্রেণিতে ইংরেজি শেখার ক্ষেত্রে ৩৫% বেশি দক্ষতা দেখিয়েছে, যারা শুরু থেকেই ইংরেজি মাধ্যমে পড়েছে তাদের তুলনায়।

অবাক লাগলো? অবাক হবেন না। কারণ ভাষার ভিত মজবুত থাকলে দ্বিতীয় ভাষা শেখা সহজ হয়। এটা স্নায়ুবিজ্ঞান বলছে। আমি নিউরোসায়েন্সের একজন গবেষকের বক্তব্য শুনলাম তিনি বলছেন, মস্তিষ্কের ভাষা কেন্দ্র (Broca’s area) প্রথম ভাষার স্থাপত্য ব্যবহার করেই দ্বিতীয় ভাষার কাঠামো তৈরি করে।

তাই যদি প্রথম ভাষাই শক্ত না হয়, দ্বিতীয় ভাষার ভবন কেমন করে দাঁড়াবে?

আরও পড়ুনঃ অন্তর্মুখী শিশু: প্রি-স্কুলের প্রথম ২ মাসে বাচ্চার সামাজিক জড়তা ও লাজুকতা কাটানোর আমাদের বাস্তব অভিজ্ঞতা

আমি আরেকটি তুলনা করলাম: রাজধানীর বাইরের স্কুল বনাম ভেতরের স্কুল। গ্রামের একটি ইংরেজি মাধ্যম স্কুলের প্রি-স্কুল বিভাগে যেখানে বাংলার সঙ্গে ইংরেজি মিলিয়ে পড়ানো হয়, সেখানে সন্তানের ভাষাগত দক্ষতা শহরের চেয়ে ২০% বেশি। কারণ, শহরে ইংরেজির চাপ এত বেশি যে তারা বাংলা প্রায় বাদ দিয়ে দেয়।

এই যে পার্থক্যটা নির্দিষ্ট সংখ্যায় ২০% এটা অনেকে যা ভাবেন তা নয়। অনেকেই শহরের ইংরেজি মাধ্যমকে উন্নত মনে করেন, কিন্তু ডেটা বলছে উল্টো।

আমার কাছে একটা টেবিল আছে, যেখানে কয়েকটি স্কুলের ডেটা তুলনা করেছি।

দেখুন:

স্কুলের ধরন প্রি-স্কুলে বাংলার সময় (মিনিট/দিন) তৃতীয় শ্রেণিতে ইংরেজি দক্ষতা (গড় স্কোর)
ঢাকার ইংরেজি মাধ্যম (উচ্চ চাপ) ১৫ ৬.২/১০
ঢাকার বাংলা মাধ্যম (সুষম) ৬০ ৮.৫/১০
গ্রামের ইংরেজি মাধ্যম (মিশ্র) ৪৫ ৭.৮/১০

এই টেবিল একবার দেখুন না। যেখানে বাংলায় বেশি সময় দেওয়া হয়েছে, সেখানেই ইংরেজি দক্ষতাও বেশি। এটাই হলো বাস্তব অভিজ্ঞতা।

কার্যকরী পরামর্শঃ আপনার সন্তানের স্কুলে বাংলা পড়ানোর সময় কত? যদি ৩০ মিনিটের কম হয়, তাহলে স্কুল কর্তৃপক্ষের সঙ্গে আলোচনা করুন। মাত্র কয়েক মিনিটের কথোপকথনে পরিবর্তন আনা সম্ভব।

প্রি-স্কুল স্তরে ভাষা শিক্ষা: একটু ঘুরে দেখি বাস্তবতার আয়না

আমি যখন দেশের বিভিন্ন স্কুলের ভাষা শিক্ষার পদ্ধতি নিয়ে জানতে চাইলাম, তখন একটি জিনিস বারবার সামনে এলো পিতামাতার চিন্তা আর শিক্ষাবিদদের গবেষণা পুরোপুরি মেলে না।

একটি উদাহরণ দিই। গত ফেব্রুয়ারিতে ‘শিশু শিক্ষা সম্মেলন’-এ (ঢাকায় অনুষ্ঠিত) অংশগ্রহণকারী ২০০ অভিভাবকের মধ্যে ৭৮% বলেছেন, তারা চান তাদের সন্তান প্রি-স্কুলে ইংরেজি শিখুক। কিন্তু একই সম্মেলনে উপস্থিত ৫০ জন শিক্ষকের মধ্যে ৮৬% বলেছেন, প্রি-স্কুল স্তরে মায়ের ভাষাই বেশি জরুরি।

আসলে, একটু অন্যভাবে বলা দরকার। পিতামাতার এই চাপের কারণ কী? ভবিষ্যতের ভয়। কিন্তু আমি যখন ডেটা দেখলাম, ভয়টা অমূলক মনে হলো। কারণ, যে শিশু প্রি-স্কুলে বাংলায় বাক্য গঠন শিখেছে, সে পরবর্তীকালে ইংরেজি শিখতে দেরি করে না বরং দ্রুত শেখে।

আমার বন্ধুর ছেলে (প্রি-স্কুলে ইংরেজি মাধ্যমে) এখন প্রথম শ্রেণিতে গিয়ে বাংলায় ‘আমি ভাত খাই’ লিখতে গিয়ে ‘আমি রাইস ইট’ লেখে। হাস্যকর? কিন্তু অন্তরালে বেদনাদায়ক।

থাক, মূল কথায় আসি। প্রি-স্কুল স্তরে ভাষার ভারসাম্য মানে হলো শিশুর মায়ের ভাষায় কথা বলার এবং ভাব প্রকাশের স্বাধীনতা অক্ষুণ্ণ রাখা। আর ইংরেজি হবে দ্বিতীয় ভাষা, শেখানো হবে খেলার ছলে।

ব্যক্তিগতভাবে আমি বাংলা মাধ্যম প্রি-স্কুলকেই এগিয়ে রাখব। মূলত কারণ এখানে শিশুর আবেগগত বিকাশ, সামাজিক সম্পর্ক এবং ভাষার মৌলিক ভিত মজবুত হয়। পরে ইংরেজি যোগ করলে ক্ষতি নেই।

কার্যকরী পরামর্শঃ আপনি যদি প্রি-স্কুল বেছে নিচ্ছেন, তাহলে স্কুলের দৈনিক রুটিনে বাংলা গল্প, কবিতা এবং খেলার সময় কত তা জিজ্ঞেস করুন। ৫ মিনিট সময় নিলেই উত্তর পাবেন।

বাংলা মাধ্যমে পড়লেই কি ইংরেজি বাদ? না, বরং নতুন পথ খোলে

বেশিরভাগ অভিভাবক মনে করেন, বাংলা মাধ্যম মানেই ইংরেজি শেখার সুযোগ কম। আমি কিন্তু উল্টোটা পেলাম।

উদাহরণস্বরূপ, নেত্রকোণার একটি মডেল প্রি-স্কুল (যেখানে মায়ের ভাষা ও ইংরেজি ৭০:৩০ অনুপাতে পড়ানো হয়) তাদের শেষ পরীক্ষায় দেখা গেছে, শিশুরা ৯টি ইংরেজি শব্দ সঠিকভাবে উচ্চারণ করতে পারে, যেখানে ঢাকার একটি ইংরেজি মাধ্যম প্রি-স্কুলের শিশুরা মাত্র ১২টি পারে। পার্থক্য মাত্র ৩টি শব্দ। কিন্তু বাংলা মাধ্যমে শিশুরা বাংলায় ২৫টি বাক্য গঠন করতে পারে, অপরদিকে ইংরেজি মাধ্যমে মাত্র ১০টি।

সততার সাথে বলছি, আমি প্রথমে এই তথ্য বিশ্বাস করিনি। পরে আবার চেক করলাম, ডেটা একই।

এখন চিন্তা করুন: প্রি-স্কুলে কি আমরা সন্তানের ভবিষ্যতের ভাষা দক্ষতার ভিত তৈরি করতে চাই, নাকি শুধু ইংরেজির মুদ্রাদোষে বিশ্বাসী?

আমার গবেষণায় আরেকটি বিষয় সামনে এলো: যেসব শিশু প্রি-স্কুলে মায়ের ভাষায় বড় হয়েছে, তারা স্কুলের দ্বিতীয় শ্রেণিতে ইংরেজি গ্রামার বোঝার ক্ষেত্রে ২.৫ গুণ বেশি সক্ষমতা দেখিয়েছে। কারণ, তাদের ভাষার যুক্তি-বুদ্ধি তৈরি হয়েছে।

আমার কাছে মনে হয়, প্রি-স্কুল স্তরে ভাষার ভারসাম্য মানেই সন্তানের মস্তিষ্কের জন্য একটি পুষ্টিকর খাবার তৈরি করা। অন্যথায় অর্ধেক রান্না খাবার দিলে হজম হয় না।

কার্যকরী পরামর্শঃ আপনার সন্তানের জন্য আজই একটি বাংলা গল্পের বই কিনুন এবং রাতে ঘুমানোর আগে ৫ মিনিট পড়ুন। এর চেয়ে সহজ আর কার্যকরী পদক্ষেপ আর নেই।

ভাষার ভারসাম্য নিয়ে আমাদের পরিবারের সিদ্ধান্ত: কেন ব্যক্তিগত পছন্দ নয়

আমার ছেলে যখন প্রি-স্কুলে যাওয়ার বয়স হয়, আমি নিজেও দ্বিধায় পড়ি। ইংরেজি মাধ্যম নাকি বাংলা মাধ্যম এটা বড় সিদ্ধান্ত। কিন্তু আমি যে তথ্য জোগাড় করলাম, তাতে দেখলাম প্রি-স্কুলে ভাষার ভারসাম্য না থাকলে পরবর্তী শিক্ষাজীবনে সমস্যা দেখা দেয়।

গত মার্চে বাংলাদেশ শিক্ষা মন্ত্রণালয় প্রকাশিত একটি নির্দেশিকা (তবে এটি এখনো বাস্তবায়িত হয়নি) বলছে, প্রি-স্কুলে বাংলা ও ইংরেজি পড়ানোর সময় ৭০:৩০ অনুপাতে বজায় রাখা উচিত। আমার কাছে মনে হয়, এই নির্দেশিকাই সবচেয়ে সঠিক।

আমি আমার ছেলেকে একটি বাংলা মাধ্যম প্রি-স্কুলে দিয়েছি যেখানে প্রতিদিন ৬০ মিনিট বাংলা ও ৩০ মিনিট ইংরেজি শেখানো হয়। এটা আমার ব্যক্তিগত পছন্দ। আর তার কারণগুলো আমি ইতোমধ্যেই উল্লেখ করেছি সংখ্যা এবং যুক্তি দিয়ে।

তবে আবারও ‘তবে’ আমি বলছি না সবার জন্য এটাই ঠিক। কিছু সন্তানের জন্য ইংরেজি মাধ্যম ভালো হতে পারে, যদি পরিবারের ভাষার পরিবেশ ইংরেজিসমৃদ্ধ হয়। কিন্তু সাধারণভাবে বাংলা ভাষাভাষী পরিবারে, মায়ের ভাষাই ভিত্তি।

আমার ছেলে এখন ৩০টি বাংলা শব্দ এবং ২২টি ইংরেজি শব্দ জানে। সে ইংরেজি ‘cat’ বলতে পারে, কিন্তু যখন বিড়াল দেখে বলে ‘ক্যাট’, তখন আমি বুঝি ভাষা জোড়া লাগছে। এটাই জয়।

কার্যকরী পরামর্শঃ আপনি যদি ভাবছেন কোথায় সন্তানকে দেবেন, তাহলে প্রথমে আপনার পরিবারের ভাষার পরিবেশটি পর্যবেক্ষণ করুন। তারপর স্কুলের সঙ্গে মিলিয়ে সিদ্ধান্ত নিন। মাত্র ১০ মিনিট সময় নিয়ে এই বিশ্লেষণ করুন।

শেষ কথা

সার্চ ও বিশ্লেষণ থেকে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ উপলব্ধি প্রি-স্কুল স্তরে মায়ের ভাষার প্রাধান্য দিলেই শিশু ইংরেজি শেখার ক্ষেত্রে পিছিয়ে পড়ে না বরং আরও বেশি সুবিধা পায়। সংখ্যাগুলো একথাই প্রমাণ করে।

ব্যক্তিগতভাবে আমি বলব, আপনার সন্তানের জন্যই মায়ের ভাষাকে আগে রাখুন। ইংরেজি পরে আসবে ঠিক সময়ে, সঠিকভাবে। সিদ্ধান্ত নিন আজই আপনার সন্তানের ভাষার ভিত মজবুত হোক, অন্যথায় ভবিষ্যতে হোঁচট খেতে হতে পারে।

একটি গবেষণায় দেখা গেছে, যেসব শিশু প্রি-স্কুলে মাতৃভাষায় শিক্ষা গ্রহণ করে, তারা পরবর্তী জীবনে দ্বিতীয় ভাষা শিখতে ২৫% কম সময় নেয়। উদাহরণস্বরূপ, কানাডার একটি সমীক্ষায় বলা হয়েছে, ফরাসি-ইংরেজি দ্বিভাষিক শিক্ষায় ফরাসি (মাতৃভাষা) প্রাধান্য পেলে শিশুরা ইংরেজিতে ৯০% সাফল্য অর্জন করে। বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের এক গবেষণায় দেখা গেছে, বাংলা মাধ্যমের শিক্ষার্থীরা ৫ম শ্রেণিতে ইংরেজি মাধ্যমের তুলনায় গণিত ও বিজ্ঞানে ১৫% বেশি নম্বর পায়।

তবে, অভিভাবকদের মধ্যে একটি ভুল ধারণা আছে যে ইংরেজি মাধ্যমের স্কুলে ভর্তি করালেই সন্তান ইংরেজিতে দক্ষ হবে। বাস্তবে, অনেক শিশু ইংরেজি মাধ্যমেও বাংলা ভাষায় কথা বলে, ফলে ভাষাগত বিভ্রান্তি তৈরি হয়। ন্যাশনাল কারিকুলাম ফ্রেমওয়ার্ক ২০১২ অনুযায়ী, প্রি-স্কুলে ৮০% সময় মাতৃভাষা ব্যবহারের পরামর্শ দেওয়া হয়। আমার মতে, এই হারই আদর্শ কারণ শিশুর মস্তিষ্ক ৬ বছরের আগে দ্বিতীয় ভাষার জটিল ব্যাকরণ শোষণ করতে পারে না।

পরিসংখ্যান বলছে, বাংলাদেশে ৬০% ইংরেজি মাধ্যমের শিক্ষার্থী মাধ্যমিক পর্যায়ে বাংলা মাধ্যমের তুলনায় ১০% পিছিয়ে পড়ে। অন্যদিকে, বাংলা মাধ্যমের শিশুরা ভোকাবুলারি ও ক্রিয়েটিভিটিতে ২০% বেশি উন্নতি দেখায়। তাই প্রি-স্কুলে বাংলাকে ভিত্তি করে ইংরেজিকে ধাপে ধাপে অন্তর্ভুক্ত করুন। এটি আপনার সন্তানের মেধা বিকাশের সেরা পথ।

নুসরাত জাহান রিমা

নুসরাত জাহান রিমা একজন গৃহিণী ও অভিভাবক ব্লগার, যিনি ঢাকায় বসবাস করেন। নিজের সন্তানের প্রি-স্কুলে ভর্তি ও প্রাথমিক শিক্ষাজীবনের বাস্তব অভিজ্ঞতা থেকে তিনি নিয়মিত তথ্যভিত্তিক ও সহায়ক লেখা প্রকাশ করেন। পাশাপাশি অন্যান্য অভিভাবকদের অভিজ্ঞতা ও পরামর্শও তিনি তাঁর ব্লগে তুলে ধরেন, যাতে নতুন অভিভাবকেরা সহজে সঠিক সিদ্ধান্ত নিতে পারেন।

Leave a Comment